বাংলাদেশের সরকারি, আধাসরকারী, স্বায়ত্বশাসিত ও এমপিওভুক্ত চাকুরিজীবীদের জীবন-জীবিকার অন্যতম ভিত্তি হলো পে স্কেল বা বেতন কাঠামো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই পে স্কেল সংশোধন ও নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়ন নিয়ে সরকারের অবস্থানকে অনেকেই ‘কানামাছি খেলা’ হিসেবে দেখছেন। কেননা এই নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকার কেমন জানি কানামাছি খেলায় নেমেছে। একেক সময় একেক ধরনের কথা বলা ইত্যাদি ইত্যাদি। একদিকে সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি হলো ন্যায্য বেতন, ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা, অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে বারবার আশ্বাস, সময়ক্ষেপণ ও অস্পষ্ট বক্তব্যই কেবল দেওয়া হচ্ছে। ফলে সরকারি চাকুরিজীবীরা হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। তার সাথে আরও রয়েছেন প্রায় ছয় লক্ষ এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারী তাদের দাবি হলো—জীবনযাত্রার ব্যয় দিন দিন আকাশছোঁয়া হওয়ায় বিদ্যমান পে স্কেল আর বাস্তবতার সাথে মানানসই নয়। চাল, ডাল, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক সরকারি চাকুরিজীবী মাসের শেষ সপ্তাহে আর্থিক সংকটে পড়ছেন। বিশেষ করে ৮ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাপন এখন অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকার একাধিকবার জানিয়েছে, নতুন পে স্কেল নিয়ে কাজ চলছে, বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে, সুপারিশ প্রণয়নও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সময়সীমা কিংবা কার্যকর করার তারিখ এখনও প্রকাশ করা হয়নি। বরং মাঝেমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে—বেতন বাড়বে কি না, বাড়লেও কত শতাংশ বাড়বে ইত্যাদি। তবে এসব কিছু এখনও চুড়ান্ত না হলেও সরকার ইতিমধ্যে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে কিছু বিষয় বলেছে যা অনেকটা ধোকাবাজির মতো। কেন বলছি একথা তাহলে দেখুন বর্তমানে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারের নতুন যে ভাবনার উদ্বেগ হয়েছে তা অনেকটা এরকম-
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আর্থিক সংকট বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনের আগে নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার সম্ভাবনা নেই। তবে পে-কমিশন প্রতিবেদন জমা দিলে সেই অনুযায়ী একটি বেতন কাঠামোর সুপারিশমালা চূড়ান্ত করবে সরকার। ভোটের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে তা বাস্তবায়ন করবে।
অবশ্য এই নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা ও বাস্তবায়ন হওয়ার আগ পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীরা নিয়ম অনুযায়ী মহার্ঘ্যভাতা প্রাপ্য হবেন। এমন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে সরকারের অর্থ বিভাগ।
এদিকে পে-কমিশন গঠনের পর ১৪ আগস্ট প্রথম সভাও করেছে কমিশন। কর্মপরিধি অনুযায়ী আগামী ছয় মাসের মধ্যে সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদন দাখিল করবে কমিশন।
সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন একটি বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হবে। কিন্তু কমিশনের প্রথম সভায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আর্থসামাজিক অবস্থা। এ অবস্থায় সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করা কতটা উপযোগী তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
এ বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কমিশনকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় রাখতে বলা হয়েছে। আমাদের পরিকল্পনা হলো সময়োপযোগী একটি বেতন কাঠামো ঘোষণা করা। তবে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিও চলছে। আমরা সময় পেলে ঘোষণা করে যাব। আর সেটা নতুন সরকার এসে বাস্তবায়ন করবে। এখানে একটি প্রশ্ন কিন্তু সরকারকে করাই যায় বর্তমান সরকার কিন্তু ইচ্ছা করলেই তাদের আমালেই এই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে পারে। এটা এভাবে ঝুলিয়ে রাখা প্রকৃত পক্ষে কিসের ইঙ্গিত বহন করে। এভাবে বারবার আশ্বাস দিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না দেওয়াকেই চাকুরিজীবীরা ‘কানামাছি খেলা’ বলে অভিহিত করছেন।
বেতন ও ভাতার অনিশ্চয়তা সরকারি চাকুরিজীবীদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, সরকার হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করছে, যাতে আন্দোলন দমন করা যায়। কিন্তু এর ফলে কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ, অসন্তোষ ও অনীহা তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সার্বিক সেবাদানে পড়তে পারে। এভাবে যদি একটি মীমাংসিত ইস্যুকে দীর্ঘদিন অনাকাঙ্খিত ভাবে ঝুলিয়ে রাখা যায় তাহলে কিন্তু ধীরে ধীরে তা জন অসন্তোষে পরিণত হবে একসময়। যা কারও কাম্য নয়। কারণ নতুন সরকার আসার পর পরই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে মাঠে নেমে পড়বে না নিশ্চয়ই তারা দিব দিচ্ছি বলতে বলতেই বেশ কিছু দিন কাটিয়ে দিবে।
সরকারি চাকুরিজীবীরা আশা করছেন, আর সময়ক্ষেপণ নয়—বরং দ্রুত কার্যকর একটি বাস্তবসম্মত, ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই পে স্কেল ঘোষণা করে তা অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর করার যাবতীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হোক। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া যেমন সহজ হবে, কারণ নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণা আসার পর থেকেই যথারীতি দ্রব্যমুল্য এর বাজার উর্ধ্ব গতি। তাই পরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এটি দ্রুত ঘোষণা ও বাস্তবায়ন জরুরী এর ফলে কর্মচারীদের অর্থনৈতিক চাপও কমবে পাশাপাশি কর্মচারীদের কর্মস্পৃহাও বাড়বে। আর সরকার যদি বারবার শুধু আশ্বাস দিয়ে যায় কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়, তবে ‘কানামাছি খেলা’ শব্দটি সরকারি চাকুরিজীবীদের মুখে আরও জোরালোভাবে উচ্চারিত হবে।
Leave a Reply