গত কয়েক বছর ধরে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীরা অবহেলিত, উপেক্ষিত ও বঞ্চিত। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের সদ্য বিদায়ী শিক্ষা উপদেষ্টা, যিনি বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন, তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, আগামী বাজেটে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা বৃদ্ধির জন্য বরাদ্দ রাখা হবে। শিক্ষকদের প্রত্যাশা ছিল যে, এই ঘোষণার পর অর্থবছরের শুরু থেকেই তারা এই সুবিধাগুলো পাবেন। কিন্তু বাজেট ঘোষণার প্রায় দুই মাস পার হলেও এ বিষয়ে বাস্তব কোনো অগ্রগতি নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাউশির পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে না কোনো নির্ভরযোগ্য বা সময়সীমাবদ্ধ তথ্য। শুধু সময়ক্ষেপণ, টালবাহানা আর বিরক্তিকর প্রতিক্রিয়ায় এখন শিক্ষক সমাজের হতাশা চরমে।
এই পরিস্থিতিতে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা আন্দোলন ব্যতীত আর কোনো কার্যকর বিকল্প দেখছেন না। সেই প্রেক্ষাপটে আগামী ১৩ আগস্ট জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের ব্যানারে এবং অন্যান্য শিক্ষক সংগঠনের সহযোগিতায় ঢাকায় একদিনের প্রতীকী আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচিকে সফল করে ভবিষ্যতের আন্দোলনের রূপরেখা নির্ধারণই হবে আমাদের পরবর্তী পথচলার নির্দেশক।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা প্রতিনিয়ত প্রশাসনিক উদাসীনতা বা আমলাদের ঔদ্ধত্যমুলক আচরেণের শিকার হয় যা একটি চলমান বিষয় তা না হলে বাজেট পূর্ব প্রতিশ্র্রুতি বা ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও এবং বাজেটে বরাদ্দ থাকার পরও আজ অবধি এর কোন প্রক্রিয়া শুরু হয়নি, যা বোঝায় যে প্রশাসনিকভাবে মন্ত্রণালয় যথেষ্ট তৎপর নয় বা বিষয়টির গুরুত্ব তাদের কাছে একেবারেই নেই। এই বিষয়ে আমলাদের স্বচ্ছতার অভাব যথেষ্ট ভাতা বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা সুস্পষ্ট বিবৃতি মাউশিই কিংবা শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেয়নি। আর একটা বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা যেন এদেশের সকলের কাছেই অবহেলার পাত্র তাদের নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও কেন জানিনা রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব যথেষ্ট পরিলক্ষিত হয়। এমপিওভুক্তদের জীবনমান উন্নয়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার কার্যত অনুপস্থিত। রাজনৈতিক দলগুলোও কেন জানি না খুব একটা প্রয়োজন মনে করে না আমাদের প্রয়োজনীয় এই প্রাপ্তিগুলোর বিষয়ে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী আমাদের এই বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাস্তায় নামা ছাড়া আর কোন উপায় আছে বলে মনে হয় না। কেননা আমাদের যারা রক্ষাকর্তা বা অভিভাবক তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যে, আপনারা যদি আমাদের বিষয়গুলো নিয়ে আগামী ১০ তারিখের মধ্যে পরিস্কার কোন বার্তা না দেন তাহলে আমরা আমাদের প্রয়োজনে যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য থাকিব। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসাবে আগামী ১৩ তারিখের এই কর্মসূচী।
এই একদিনের কর্মসূচি নিছক একটি প্রতিবাদ নয়, বরং এটি হবে একটি ঐতিহাসিক ‘বাইন্ডিং মোমেন্ট’। এখান থেকেই নির্ধারিত হবে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের পরবর্তী গণআন্দোলনের রূপরেখা। তাই এই কর্মসূচিকে সফল করতে হবে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ও একতাবদ্ধ অংশগ্রহণের মাধ্যমে। আমরা যদি আমাদের ন্যয্য পাওনাগুলো পেতে চাই তাহলে আমাদের সকলের নিজ দায়িত্বে উচিত আগামী ১৩ তারিখের কর্মসুচিতে অংশগ্রহণ করা।
আমরা শিক্ষক, আমরা আলোর পথের প্রদর্শক। অথচ নিজেদের মৌলিক অধিকার নিয়ে আজ আমাদের রাস্তায় নামতে হয়, কষ্টে থাকা সহকর্মীর পাশে দাঁড়াতে হয়, অবহেলা-উপেক্ষার জবাব দিতে হয়। এই আন্দোলন কেবল বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা কিংবা শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতার জন্য নয়; এটি সম্মান, মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। অতএব, এই আন্দোলনকে ব্যক্তিগত আন্দোলন না ভেবে, সম্মিলিত ভাবে ভাবতে হবে; ভাবতে হবে হৃদয় দিয়ে। আবার পাশাপাশি এটা খেয়াল রাখতে হবে যে, এই আন্দোলনকে কেউ যেন তার ব্যাক্তি স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার না করতে পারে।
আগামী ১৩ আগস্টের আন্দোলন কেবল একটি কর্মসূচি নয়, বরং এটি হবে একটি যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা। আমাদের অধিকার আমাদেরই ছিনিয়ে নিতে হবে সম্মিলিতভাবে, পরিকল্পিতভাবে এবং সর্বোপরি ঐক্যবদ্ধভাবে। আন্দোলনের সফলতা নির্ভর করছে প্রত্যেক শিক্ষক-কর্মচারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ, প্রচার, প্রচেষ্টা ও প্রতিজ্ঞার উপর।
এই আন্দোলন যেন হয় সুসংগঠিত, শান্তিপূর্ণ এবং দৃঢ় বার্তার বাহক— “আমরা বঞ্চিত হতে আসিনি, আমরা অধিকার বুঝে নিতে এসেছি।”
Leave a Reply