মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমিক শাখায় টাকার বিনিময়ে শিক্ষক এমপিওভুক্তির দুর্নীতিপূর্ণ প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত রয়েছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিশেষ করে ‘দারুল’ নামক অবৈধ বিএড কলেজসহ আরও বেশ কিছু অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান থেকে বিএড ডিগ্রিধারীদের এমপিওভুক্ত করা হচ্ছে। অথচ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষাবোর্ড বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি না পেলেও, কাজীর গরু কাগজে আছে—এই পদ্ধতিতে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে তাদের এমপিওভুক্ত করা হচ্ছে।
প্রক্রিয়াটি এতটাই প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে উঠেছে যে, সংশ্লিষ্ট ফাইল একাধিকবার আটকে রেখে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ‘নতুন করে’ ঘুষ আদায় করা হয়। ঘুষ না দিলে বা যোগাযোগ না থাকলে ফাইল মাসের পর মাস পড়ে থাকে। অথচ যাদের সঙ্গে সিন্ডিকেটের ‘সমঝোতা’ আছে, তাদের ফাইল মাত্র এক-দুই দিনের ব্যবধানে গৃহীত হয়ে যায়। এতে করে যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে টাকার অঙ্ক ও পৃষ্ঠপোষকতা।
এ ধরণের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত একাধিক কর্মকর্তার নাম উঠে এলেও, তাদের অনেকেই এখনো অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন ২০১৮ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত মাউশির মনিটরিং শাখায় কর্মরত ছিলেন। দুর্নীতির বিস্তৃত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কোনও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ‘প্রশাসনিক রদবদলের’ নামে তাকে মনিটরিং শাখা থেকে সরিয়ে আনা হয় মাধ্যমিক শাখায়, যেখানে এখন আরও বেশি দায়িত্ব ও ক্ষমতা তার হাতে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধা জেলার মনোহরপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) মো. রবিউল ইসলাম—যার এমপিওভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নেই—তাকে ৫ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন থাকলেও, সেই সব নিয়মের তোয়াক্কা না করে শুধুমাত্র আর্থিক লেনদেনের ভিত্তিতে তার পক্ষে এমপিও চিঠি ইস্যু করা হয়। এটি সেই সিন্ডিকেটের একটি উদাহরণ, যারা ঘুষের বিনিময়ে নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে এমপিও প্রদান করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।

ঘুষ না দেওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আরও একটি উদাহরণ পাওয়া গেছে চট্টগ্রামের বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। অভিযোগ উঠেছে, উক্ত বিদ্যালয়ের অতিরিক্ত ৮টি শ্রেণি শাখা অনুমোদনের জন্য পাঠানো ফাইলটি পাঁচ মাস ধরে আটকে রাখা হয়েছে কেবল ঘুষ না দেওয়ার কারণে। সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফাইলটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য সব নিয়মকানুন পূরণ করলেও, মাধ্যমিক শাখার এক কর্মকর্তা প্রতিটি শাখার জন্য ১০ হাজার টাকা হারে মোট ৮০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেছেন।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, ফাইলটি যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) সরাসরি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও উপপরিচালক (মাধ্যমিক)-এর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। তিনি ফাইলটি ছাড়িয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু এতসব আনুষ্ঠানিক হস্তক্ষেপ ও আবেদনের পরও পনেরো দিন পার হয়ে গেলেও ফাইলটি একইভাবে টেবিলেই পড়ে রয়েছে। এতে করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, এবং শিক্ষার্থীদের নতুন শাখায় ভর্তির বিষয়টিও ঝুলে গেছে।
এই ঘুষের দাবির অভিযোগ যখন জোরালো হচ্ছে, তখনই মাধ্যমিক শাখার অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পক্ষ নিয়ে সাফাই গাইতে দেখা গেছে মাউশির এক পরিচালককে। তিনি সংবাদমাধ্যম দৈনিকশিক্ষাডটকমকে বলেন, “ওর তো নিজেরই অনেক টাকা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কতটা সত্য সেটা তো প্রমাণ হয়নি। তা ছাড়া এই বিষয়টি তো বিল্লাল মাস্টারের তদবিরে এসেছে। তাই ওদের কিছু বললে আমারই চেয়ার থাকবে না।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে দুর্নীতির সুরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ তদবিরের রাজনীতির বাস্তব চিত্র প্রকাশ পেয়েছে।
এই ঘটনাটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; বরং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির কতটা গভীরতা তৈরি হয়েছে, সেটারই প্রতিফলন। যেখানে একাধিক পর্যায়ের অনুরোধ উপেক্ষা করে ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল না ছাড়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছে, সেখানে শিক্ষা প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়। একইসঙ্গে তদবিরের প্রভাবে কর্মকর্তাদের দায় এড়ানোর প্রবণতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের প্রতাপ প্রকাশ পেয়েছে।

অভিযুক্ত আরেকজন মাধ্যমিক শাখার কর্মকর্তার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, তার পক্ষেও একইভাবে সাফাই গেয়ে মাউশি অধিদপ্তরের একই পরিচালক বলেন, ‘ও তো সমবায় ব্যবসা করে। তাই কিছু টাকা লেনদেন করে। ওই টাকা ঘুষের কি-না, তা দেখতে হবে।’ এমন বক্তব্যে অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখার পরিবর্তে দোষী ব্যক্তিকে আড়াল করার চেষ্টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আজাদ খান বলেন, ‘যেই পার্টিই করুক না কেন, ঘুষ লেনদেনের পক্ষে কোনো পার্টিই নেই। তাই পার্টির তদবিরের দোহাই দিয়ে মাউশি অধিদপ্তরের দুর্নাম করতে দেওয়া হবে না।’ তিনি আরও জানান, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং যথাযথ প্রমাণ পাওয়ামাত্রই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
(সংগৃহিত)
Leave a Reply