জাতীয়করণ না হওয়া পর্যন্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী জোটের সদস্যসচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী। বুধবার (২২ অক্টোবর) সকালে নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে ইনশা-আল্লাহ। আমরা পিছিয়ে যাইনি, বরং সরকারকে সময় দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য শুধু বাড়িভাতা নয়, পূর্ণ জাতীয়করণ।”
অধ্যক্ষ আজিজীর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শিক্ষক সমাজের বৃহত্তর দাবি—বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণের বিষয়টি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। তাঁর মতে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলেও এখনো বৈষম্যের শিকার। সরকারি শিক্ষকদের সঙ্গে একই যোগ্যতা ও দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে প্রাপ্য সম্মান, সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত।
অন্যদিকে, টানা আট দিনের কর্মবিরতির পর আজ বুধবার (২২ অক্টোবর) থেকে সারাদেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা শ্রেণিকক্ষে ফিরেছেন। গতকাল মঙ্গলবার রাতে শিক্ষক নেতারা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আন্দোলন সাময়িক স্থগিতের ঘোষণা দেন। সরকারের পক্ষ থেকে বাড়িভাড়া ভাতা আংশিক বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ায় তাঁরা আপাতত ক্লাসে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। তবে তারা জানিয়েছেন, “দাবি পূরণের অগ্রগতি না হলে আবারও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।”
এর আগে, গত ১২ অক্টোবর থেকে বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবিতে শিক্ষক-কর্মচারীরা লাগাতার কর্মসূচি পালন করছিলেন। তাদের প্রধান দাবি ছিল—
*এমপিওভুক্তদের বাড়িভাড়া ভাতা ২০ শতাংশে উন্নীত করা,
*কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ৭৫ শতাংশে উন্নীত করা,
*চিকিৎসা ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকায় বাড়ানো।
দীর্ঘ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ অবশেষে দুই ধাপে বাড়িভাড়া ভাতা ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির বিষয়ে সম্মতি দেয়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোস. শরিফুন্নেসা স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়,
২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতা মূল বেতনের ৭.৫ শতাংশ (সর্বনিম্ন ২,০০০ টাকা) নির্ধারণ করা হবে।
পরবর্তী ধাপে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে আরও ৭.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, অর্থাৎ মোট ১৫ শতাংশ (সর্বনিম্ন ২,০০০ টাকা) হারে কার্যকর হবে।
প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, “সরকারের বিদ্যমান বাজেট সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে অন্যান্য ভাতা পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিক্ষক সমাজের ন্যায্য দাবিগুলো বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে অন্যান্য ভাতাও সমন্বয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখনই শিক্ষা জাতীয়করণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
শিক্ষক নেতারা বলছেন, সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে তারা আংশিক সাফল্য মনে করছেন, কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত হবে তখনই, যখন বেসরকারি শিক্ষা পুরোপুরি জাতীয়করণ করা হবে। তাদের ভাষায়, “আমরা রাষ্ট্রের সন্তান, বৈষম্যের নয়—সমঅধিকারের দাবি নিয়ে মাঠে আছি, থাকবও।”
চলমান এ আন্দোলন এবং সরকারের প্রতিক্রিয়া দেশের শিক্ষা খাতে এক নতুন মোড় এনেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বাড়িভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা শিক্ষকদের চাপ কমালেও জাতীয়করণের দাবিটি আগামী দিনে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
Leave a Reply