পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ কঠোর ভাষায় অভিযোগ করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদন বা নির্দেশনা ছাড়াই প্রশাসনের কিছু প্রভাবশালী আমলা পেছনে থেকে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন, যা সরকারের নীতিনির্ধারণী কাজে জটিলতা ও বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
শনিবার (১৮ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ অভিযোগ তোলেন। সভার বিষয় ছিল—
“বৈশ্বিক ও অন্যান্য কারণে সৃষ্ট অর্থায়ন সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর বর্তমান অবস্থা ও করণীয়।”
সভায় দেশের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তব্যে অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন,
“অন্তর্বর্তী সরকার কিছু না বলার আগেই অনেক আমলা নিজেদের মতো করে নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছেন। সরকারকে না জানিয়ে এই সব উদ্যোগ সরকারের জন্য নতুন নতুন সমস্যা তৈরি করছে।”
তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লা ও নোয়াখালীকে পৃথক বিভাগ করার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছে। কিন্তু এসব দাবির পেছনে আসলে “জনস্বার্থের চেয়ে প্রশাসনিক স্বার্থই বেশি কাজ করছে।”
তার ভাষায়,
“আমি জানতে পেরেছি—এই দুই বিভাগ গঠনের বিষয়ে প্রশাসনের ভেতর থেকেই কিছু লোক উদ্যোগ নিয়েছেন। এমনকি তারা সরকারকে না জানিয়ে একটি কমিটিও গঠন করে ফেলেছেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে—নতুন বিভাগ তৈরি হলে নতুন পদ সৃষ্টি হবে, নতুন ক্ষমতা ও সুযোগ আসবে।”
পরিকল্পনা উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কোনোভাবেই নতুন বিভাগ গঠনের পরিকল্পনা নেই।
তিনি বলেন,
“আমাদের সরকারের মূল লক্ষ্য নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি নয়, বরং জনগণের জীবনমান উন্নয়ন করা। এখন সরকারের অগ্রাধিকার হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমানো, ঘুষ ও দুর্নীতি কমানো, এবং জনগণের জন্য সেবার মান নিশ্চিত করা।”
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরও যোগ করেন,
“কুমিল্লা নতুন বিভাগ হবে কি না, নোয়াখালী বিভাগ হবে কি না—এগুলো মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য আমাদের যে সংস্কার কর্মসূচি চলছে, তার সঙ্গেও এই বিষয়গুলোর কোনো সম্পর্ক নেই।”
দেশে চলমান বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার আন্দোলনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
“এখন দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একের পর এক আন্দোলনের কর্মসূচি দিচ্ছেন। অনেকের মনে হয়েছে—অন্তর্বর্তী সরকারের আর তিন মাস সময় আছে, তাই এখনই যতদূর সম্ভব দাবি তুলতে হবে। ফলে সবাই এখন নিজের দাবিকে সামনে আনতে ব্যস্ত।”
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ রসিকতার সুরে আরও বলেন,
“আপাতত আন্দোলনের সবগুলো জায়গাই অকুপাইড হয়ে গেছে। আগে থেকে বুকিং না দিলে নতুন আন্দোলনকারীরা জায়গা পাবে না।”
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের বক্তব্যে স্পষ্ট বার্তা হলো—
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কেউ যেন নিজস্ব স্বার্থে প্রশাসনিক উদ্যোগ বা আন্দোলন-সংঘাত সৃষ্টি না করে, কারণ এতে সরকারের স্থিতিশীলতা ও নীতি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন,
“এই সময়ে সরকারের একমাত্র লক্ষ্য হলো অর্থনীতি ও প্রশাসনকে শৃঙ্খলায় আনা, সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং স্বচ্ছভাবে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথ তৈরি করা।”
সবশেষে তিনি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সতর্ক করে বলেন,
“সরকারের অজান্তে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তার দায় সরকার নেবে না। আমলাদের উচিত সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো রূপান্তরের পর্যায়ে রয়েছে।”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ মূলত ইঙ্গিত দিয়েছেন—অন্তর্বর্তী সরকারের পেছনে প্রশাসনিক এক শ্রেণির ব্যক্তি নিজেদের ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টায় সক্রিয়, যা সরকারের জন্য ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
Leave a Reply