মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া ভাতার দাবিতে টানা সাত দিন ধরে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান করছেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শিক্ষক-কর্মচারীদের তিন দফা দাবি—মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া, মেডিকেল ভাতা ১,৫০০ টাকায় উন্নীত করা, এবং উৎসব ভাতা বৃদ্ধি। কিন্তু দফায় দফায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক ও আলোচনার পরও কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত না আসায় আন্দোলন এখন আরও জোরালো রূপ নিয়েছে।
প্রথমদিকে আন্দোলনকারীরা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’ অভিমুখে পদযাত্রার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তারা সেই পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন। এখন তারা শহীদ মিনারে অবস্থান, অনশন ও ‘ভুখা মিছিল’-এর মতো প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি আদায়ের পথ বেছে নিয়েছেন। তাদের মতে, সরকারের সঙ্গে সংলাপ ব্যর্থ হলেও, শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক পদ্ধতিতে আন্দোলন চালিয়েই তারা শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে চান।
জোটের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী—যদি আন্দোলনকারীরা যমুনা অভিমুখে লং মার্চ করেন, তাহলে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী সুযোগ নিয়ে ওই মিছিলে অনুপ্রবেশ করতে পারে, যা আন্দোলনকে অন্যদিকে নিয়ে যেতে পারে। এতে আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ চরিত্র ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটতে পারে। এ কারণেই আপাতত তারা ‘লং মার্চ’ কর্মসূচি থেকে সরে এসেছে।
তবে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—তাদের দাবি আদায় না হলে শেষ পর্যায়ে তারা যমুনা অভিমুখে লং মার্চে যাবেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজীজি বলেন, “আমরা আন্দোলনকে কোনো অবস্থাতেই রাজনৈতিক বা সহিংস করতে চাই না। কিন্তু যদি সরকার আমাদের দাবি উপেক্ষা করে, তবে শিক্ষক সমাজ একজোট হয়ে যমুনা অভিমুখে লং মার্চে নামবে। আমাদের শিক্ষকদের ওপর হামলার আশঙ্কা আছে বলেই আপাতত আমরা সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছি। তবে প্রয়োজনে এই কর্মসূচি দিতেও আমরা বাধ্য হব।”
এদিকে দাবি আদায়ের আন্দোলনকে আরও তীব্র করতে আন্দোলনরত শিক্ষকরা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। আগামীকাল রবিবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে থালা-বাটি হাতে ‘ভুখা মিছিল’ করবেন তারা। এই মিছিলটি শহীদ মিনার থেকে শুরু হয়ে শিক্ষা ভবনের দিকে যাবে। সংগঠকরা জানিয়েছেন, এই ‘ভুখা মিছিল’ হবে ক্ষুধার্ত অবস্থায় পরিচালিত এক প্রতীকী প্রতিবাদ, যার মাধ্যমে শিক্ষক সমাজ সরকারের কাছে জানাতে চায়—তাদের জীবনযাপন আজ মানবেতর হয়ে পড়েছে।
ভুখা মিছিলের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেলাওয়ার হোসেন আজীজি বলেন, “ভুখা মিছিল মানে হলো—ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাজপথে নামা। আমরা শিক্ষকরা আজ সত্যিকার অর্থেই অনাহারে আছি, আমাদের সম্মান, মর্যাদা ও ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত। তাই এই মিছিলের মাধ্যমে আমরা সরকার ও সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা ২০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া ভাতা চাইলে সেখানে ২০ মানে ২০; মেডিকেল ভাতা চাইলে ১,৫০০ মানে ১,৫০০—এখানে কোনো কাটছাঁট বা সমঝোতার সুযোগ নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের দাবি পূরণ না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সারা দেশের শিক্ষক সমাজ রাজপথ ছাড়বে না। প্রয়োজনে আমরা রক্ত দেব, তবু আমাদের দাবি আদায় করে ছাড়ব।”
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ জানায়, তারা এখন কূটনৈতিক যোগাযোগ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থন অর্জনের দিকেও নজর দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রধান রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েছে। তারা মনে করছেন, সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ যত বাড়বে, তাদের দাবি তত দ্রুত বাস্তবায়নের সম্ভাবনা থাকবে।
শিক্ষক সমাজের এই দীর্ঘ আন্দোলন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে—যারা জাতি গঠনের কারিগর, তাদের ন্যায্য প্রাপ্য নিয়ে এতদিন ধরে কেন এমন অবহেলা চলছে? শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তারা বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করছেন। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় এখনো ২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা বৃদ্ধিতে সম্মতি দেয়নি।
সবমিলিয়ে বলা যায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের এই আন্দোলন এখন এক ঐতিহাসিক পর্বে দাঁড়িয়ে আছে। তারা শান্তিপূর্ণ উপায়ে দাবি আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু সেই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ যদি ব্যর্থ হয়, তবে তারা রাজপথে আরও কঠোর কর্মসূচি নিতে প্রস্তুত।
Leave a Reply