বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের চলমান আন্দোলনের মুখে আবারও সংলাপে বসার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষকদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খোঁজার আশায় শনিবার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ আহ্বান জানানো হয়।
মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ইতোমধ্যে শিক্ষা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শিক্ষক আন্দোলনের যৌক্তিকতা স্বীকার করেছেন এবং দ্রুত সমাধানের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। আলোচনায় জানা যায়, শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল দাবি হলো—বাড়িভাতা ২০ শতাংশে উন্নীত করা, মেডিকেল ভাতা বাড়ানো এবং উৎসব ভাতা সরকারি কর্মচারীদের সমপর্যায়ে নির্ধারণ করা।
একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করতে চাই। দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের যেমন শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও অচল হয়ে পড়ছে। আমরা চাই না শিক্ষা ব্যবস্থা অচল হোক। আমাদের মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের দাবিকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করছে না; বরং আমরা তাদের পাশে আছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়। অর্থ মন্ত্রণালয় বর্তমানে বাজেট ঘাটতির কথা বলে ৫ শতাংশের বেশি বাড়ি ভাতা বৃদ্ধিতে অনীহা প্রকাশ করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষকরা যদি আলোচনায় বসেন, তাহলে যৌক্তিক সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে। আন্দোলনের মাধ্যমে কিছু সময়ের জন্য জনমত আদায় সম্ভব হলেও, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আসে কেবল আলোচনার মাধ্যমেই।”
এর আগে ৫ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়িভাতা মাত্র ৫০০ টাকা বৃদ্ধি করে। এ প্রজ্ঞাপন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তা প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষকরা রাস্তায় নামেন। ৭ অক্টোবর থেকে টানা আন্দোলন শুরু হয় রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।
১৩ অক্টোবর প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের লাঠিচার্জে বেশ কয়েকজন শিক্ষক আহত হলে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। শিক্ষক নেতারা তখন ঘোষণা দেন—তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
১৫ অক্টোবর শিক্ষকরা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে রাখেন আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। এতে রাজধানীর যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন ১৬ অক্টোবর তারা ঘোষণা দেন, প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ও রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা অভিমুখে পদযাত্রা’ করবেন। কিন্তু শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরারের অনুরোধে ও আলোচনার আশ্বাসে তারা সাময়িকভাবে কর্মসূচিটি স্থগিত রাখেন।
এরপর ১৭ অক্টোবর থেকে আন্দোলনকারীরা শুরু করেন আমরণ অনশন কর্মসূচি। অনশনরত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে কয়েকজন ইতোমধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তবু তারা আন্দোলন থেকে সরে আসতে রাজি নন। আন্দোলনকারীদের দাবি, “আমরা সরকারবিরোধী নই; আমরা ন্যায্য অধিকার চাই। বাড়ি ভাড়া ৫ শতাংশ নয়, ২০ শতাংশ হতে হবে।”
আজ শনিবার (১৮ অক্টোবর) সকাল থেকেই শিক্ষক-কর্মচারীরা শহীদ মিনারে কালো পতাকা মিছিল করেন। তাদের হাতে দেখা যায় থালা-বাটি—প্রতীকীভাবে ‘ভুখা মিছিল’ নামে এই প্রতিবাদে তারা জানাচ্ছেন, “আমরা শিক্ষার আলো ছড়াই, অথচ আমাদের ঘরে চুলা জ্বলে না।”
একই সঙ্গে তারা ঘোষণা দিয়েছেন, সরকার যদি আলোচনার উদ্যোগ বাস্তবায়ন না করে কিংবা অর্থ মন্ত্রণালয় তাদের দাবির বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না দেয়, তবে তারা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাবেন। এর মধ্যে জাতীয় প্রেস ক্লাব, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় অভিমুখে পদযাত্রা, গণঅনশন ও জেলা পর্যায়ে অবরোধ কর্মসূচির প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা চাইছেন দ্রুত একটি বৈঠক আহ্বান করতে যাতে শিক্ষক প্রতিনিধি, শিক্ষা উপদেষ্টা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা একসঙ্গে বসে সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে পান। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র জানায়, “আমরা আলোচনার দরজা খোলা রেখেছি। শিক্ষকরা যদি বসতে রাজি হন, তবে একটি ইতিবাচক সমাধান আসা সম্ভব।”
সারসংক্ষেপে বলা যায়, শিক্ষকদের দাবির বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সহানুভূতিশীল হলেও আর্থিক সংকটের কারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ই এখন প্রধান বাধা। একদিকে শিক্ষকরা রাস্তায়, অন্যদিকে প্রশাসন আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজছে—এমন এক অচলাবস্থায় ঝুলে আছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা।
Leave a Reply