২০ শতাংশ বাড়ি ভাড়াসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন—এটাই আন্দোলনের শেষ ধাপ। সরকারের দৃষ্টি যদি এবারও দাবি বাস্তবায়নের দিকে না যায়, তবে তারা বাধ্য হবেন রোববার থেকে ‘যমুনা ঘেরাও’ কর্মসূচি দিতে। এই ঘোষণা দেওয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষকদের চলমান আন্দোলন আরও তীব্র ও বিস্তৃত আকার ধারণ করছে।
শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত হন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা হাজারো শিক্ষক-কর্মচারী। সকাল থেকেই ব্যানার, প্ল্যাকার্ড ও কালো পতাকা হাতে তারা মিনার প্রাঙ্গণে অবস্থান নেন। কেউ কেউ মাথায় কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদের প্রতীক তুলে ধরেন। ‘২০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া চাই—ন্যায্য দাবি থেকে পিছু হটবো নাই’, ‘শিক্ষক বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে’, ‘ঘুষের অপবাদ নয়, সম্মান চাই’—এমন নানা শ্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
দুপুরের দিকে শহীদ মিনার থেকে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করে শিক্ষকরা টিএসসি অভিমুখে যাত্রা করেন। রোদের তাপ উপেক্ষা করে শত শত শিক্ষক-কর্মচারী হাতে ব্যানার উঁচিয়ে হাঁটতে থাকেন। মিছিল শেষে টিএসসি এলাকায় আয়োজিত সমাবেশে আন্দোলনরত শিক্ষক নেতারা সরকারের প্রতি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী। তিনি বলেন,
“আমরা ছয় দিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছি। আমরা ভাঙচুর করিনি, রাস্তায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করিনি। অথচ সরকার এখনো আমাদের দিকে ফিরেও তাকায়নি। আমাদের দাবি—২০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি এবং পূর্ণ জাতীয়করণ। এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়, এটি টিকে থাকার দাবি। যদি শনিবারের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি না হয়, তাহলে রবিবার আমরা ‘যমুনা ঘেরাও’ কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।”
আজিজী আরও বলেন,
“শিক্ষকরা ঘুষ দিয়ে এমপিও হয়েছেন—এমন অপমানজনক বক্তব্য আমরা মেনে নিতে পারি না। যিনি এ কথা বলেছেন, তাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে এবং সরকারকে এই বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে। শিক্ষকদের সম্মান ক্ষুণ্ণ করে কেউ বেঁচে থাকতে পারবে না।”
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন,
“আমরা সরকারের শত্রু নই। আমরা জাতি গঠনের কারিগর। আমাদের সঙ্গে সংলাপে বসে সমস্যা সমাধান করা হোক। কিন্তু যদি উপেক্ষা করা হয়, তাহলে আন্দোলনের দায় সরকারকেই নিতে হবে।”
এ সময় বিভিন্ন জেলার শিক্ষক নেতারাও বক্তব্য দেন। তারা বলেন, বছরের পর বছর ধরে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সরকারি শিক্ষকরা যেখানে নিয়মিত বেতন-ভাতা বৃদ্ধি ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, সেখানে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। তারা জানান, বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ভাড়ার চাপে শিক্ষক সমাজ প্রায় দেউলিয়া অবস্থায় পৌঁছেছে।
বক্তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন,
“এবারের আন্দোলন কোনো প্রতীকী কর্মসূচি নয়। আমরা প্রজ্ঞাপন হাতে না পাওয়া পর্যন্ত রাস্তায় থাকব। কাল (শনিবার) কালো পতাকা মিছিল হবে। এরপরও যদি সরকার কর্ণপাত না করে, তাহলে রবিবার থেকে যমুনা অভিমুখে পদযাত্রা শুরু হবে।”
শিক্ষকদের বিক্ষোভে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ ও ছাত্র সংগঠনের নেতারাও। তারা বলেন, শিক্ষক অবমাননা জাতির ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে। যে রাষ্ট্র শিক্ষককে সম্মান দেয় না, সে রাষ্ট্র কখনোই টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না।
দিনভর বিক্ষোভ শেষে বিকেলে অনশন কর্মসূচি শুরু করেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। কেউ কেউ শুয়ে থেকে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। একাধিক শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়লেও তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
শিক্ষক নেতারা জানান, এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য সরকারের সঙ্গে সংঘাত নয়, বরং শিক্ষা খাতকে বাঁচানো। তারা বলেন,
“আমরা শিক্ষকদের ঘাম আর রক্তে জাতি গড়ি। আজ সেই শিক্ষকরাই জীবিকা নির্বাহে অক্ষম। সরকার যদি এখনো না শোনে, তাহলে এই আন্দোলন ঢাকা থেকে শুরু হয়ে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়বে।”
সমাবেশ শেষে আবারও জোরালো শ্লোগান ওঠে—
“প্রজ্ঞাপন চাই, এখনই চাই!”,
“ন্যায্য দাবি বাস্তবায়ন না হলে, যমুনা ঘেরাও অনিবার্য!”
এভাবে শুক্রবারের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ শেষে শিক্ষক সমাজের আন্দোলন এক নতুন মোড়ে পৌঁছেছে, যা আগামী দিনগুলোতে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
Leave a Reply