তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ওপর পুলিশের অমানবিক হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। সংগঠনটি মনে করে, শিক্ষকদের ওপর এ ধরনের দমননীতি কেবল একটি আন্দোলনের ওপর আঘাত নয়, বরং গোটা শিক্ষা সমাজের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকারের ওপর বর্বর আঘাত।
রবিবার (১২ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শিক্ষকদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে পুলিশ লাঠিচার্জ, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং জলকামান থেকে পানি ছোঁড়ে। এতে বহু শিক্ষক আহত হন, কেউ কেউ গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এমন একটি অমানবিক ঘটনার পর শিক্ষা সমাজে নিন্দার ঝড় বইছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষক সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও শিক্ষার্থীরা সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
এই প্রেক্ষাপটে সোমবার (১৩ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান, যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম ও অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার বলেন, “একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকদের সভা-সমাবেশ করা সাংবিধানিক অধিকার। ন্যায্য দাবি নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করা কোনো অপরাধ নয়। অথচ শিক্ষকদের মতো সম্মানিত পেশাজীবীদের ওপর পুলিশের এই বর্বর হামলা রাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।”
বিবৃতিতে তারা বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের তিন দফা দাবি—মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা দেড় হাজার টাকা এবং উৎসব ভাতা ৭৫ শতাংশ—এসব কোনো বিলাসিতা নয়, বরং শিক্ষকদের জীবিকা ও মর্যাদা টিকিয়ে রাখার ন্যূনতম শর্ত। তারা যুক্তি দেন, দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি শিক্ষকেরা বেতন-ভাতা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। বর্তমান বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এসব দাবি বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
সাদা দলের নেতারা আরও বলেন, “শিক্ষকদের আন্দোলন দমন করা মানে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে দমন করা। যাদের কাঁধে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের দায়িত্ব, তাদের প্রতি এমন আচরণ কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি একদিকে মানবাধিকারের লঙ্ঘন, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চরম অপমান।”
তারা সরকারকে সতর্ক করে বলেন, “শিক্ষক সমাজের ক্ষোভকে অবমূল্যায়ন করে দমননীতিতে গেলে তার পরিণতি শুভ হবে না। বরং এটি শিক্ষাক্ষেত্রে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে, যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।”
বিবৃতিতে সাদা দল দাবি করে—
১️⃣ আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর হামলায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
২️⃣ শিক্ষকদের তিন দফা ন্যায্য দাবি অবিলম্বে মেনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
৩️⃣ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহকে ধাপে ধাপে জাতীয়করণের রূপরেখা ও সময়সূচি ঘোষণা করতে হবে, যাতে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান ঘটে।
নেতারা বলেন, “আমরা মনে করি, শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে কোনো সমাজ উন্নতির পথে এগোতে পারে না। আজ যারা আমাদের সন্তানদের শিক্ষিত করছে, তাদের জীবনমান নিশ্চিত না করলে শিক্ষার মান রক্ষা করা সম্ভব নয়।”
শেষে সাদা দল আন্দোলনরত শিক্ষকদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলে, “আমরা তাদের পাশে আছি, কারণ তাদের দাবি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন ও ন্যায়বিচারের দাবির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা আশা করি, সরকার শিক্ষকদের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে, যাতে এই অচলাবস্থা নিরসন হয় এবং শিক্ষা অঙ্গনে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।”
🔹 সাদা দল আরও সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ভবিষ্যতে যদি শিক্ষক সমাজের প্রতি দমননীতি অব্যাহত থাকে, তবে এর প্রতিবাদে তারা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিক অবস্থান কর্মসূচি ও প্রতীকী প্রতিবাদ আয়োজন করতে বাধ্য হবে।
চূড়ান্তভাবে সংগঠনটি সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়—
“শিক্ষক সমাজকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করুন। তাদের দাবি মেনে নিয়ে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করুন; তাহলেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের শিক্ষিত, আলোকিত ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।”
Leave a Reply