এক দশক পর দেশে আবারও নতুন পে কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা ও আলোচনার ঢেউ। এবারের পে কমিশন শুধু বেতন বৃদ্ধির দিকেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দীর্ঘদিনের আলোচনার পর এবার প্রথমবারের মতো গ্রেড সংখ্যা কমানো হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত কমিয়ে বৈষম্য দূর করার দিকেও মনোযোগী হয়েছে কমিশন। ফলে এবারের পে স্কেলকে ঘিরে কর্মজীবী মহলে কৌতূহল, আশা এবং সংশয়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের মূল উদ্বেগ এখন—মূল বেতন কত শতাংশ বাড়ানো হবে। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহল থেকে শোনা যাচ্ছে, এবারের প্রস্তাবে মূল বেতন দ্বিগুণ করার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এর আগে দেশে মোট ৮ বার পে কমিশন গঠন করা হয়েছে। প্রতিবারই ন্যূনতম ৫০ শতাংশের বেশি বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে লক্ষ্য করা গেছে, সাধারণত নিচের গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে, যাতে নিম্নস্তরের কর্মীরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পান।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রণয়ন করা হয় দেশের প্রথম পে স্কেল। সে সময় সর্বনিম্ন বেতন ধরা হয়েছিল মাত্র ১৩০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ২ হাজার টাকা। অর্থাৎ, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত দাঁড়ায় ১৫.৩৭:১। স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই স্কেলকে তখনকার জন্য যুগান্তকারী মনে হলেও বেতনের ব্যবধান প্রকটভাবে প্রকাশ পায়।
চার বছর পর ১৯৭৭ সালে গঠিত দ্বিতীয় পে কমিশন সর্বনিম্ন বেতন ৭৩ শতাংশ বাড়িয়ে ২২৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করে। এর ফলে অনুপাত কিছুটা কমে দাঁড়ায় ১৩.৩৩:১। এই পরিবর্তন নিম্ন আয়ের কর্মীদের আংশিক স্বস্তি দিলেও বৈষম্যের ব্যবধান তখনও যথেষ্ট ছিল।
পরবর্তী আট বছর পর, ১৯৮৫ সালে তৃতীয় পে কমিশন গঠিত হয়। এতে সর্বনিম্ন বেতন দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করা হয় (১২২.২% বৃদ্ধি) এবং সর্বোচ্চ বেতন দ্বিগুণ করে ৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। এতে অনুপাত কমে দাঁড়ায় ১২:১। এই পর্যায়ে প্রথমবারের মতো বৈষম্য হ্রাসের দিকে বাস্তব পদক্ষেপ দেখা যায়।
১৯৯১ সালে ঘোষিত চতুর্থ পে কমিশনে সর্বনিম্ন বেতন করা হয় ৯০০ টাকা (৮০% বৃদ্ধি) এবং সর্বোচ্চ বেতন ১০ হাজার টাকা (৬৬.৬৬% বৃদ্ধি)। অনুপাত আরও কিছুটা কমে দাঁড়ায় ১১.১১:১। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে অর্থনীতির নতুন ধারা এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন কর্মচারীদের জন্য ইতিবাচক ছিল।
ছয় বছর পর ১৯৯৭ সালে পঞ্চম পে কমিশন গঠিত হয়। এই স্কেলে প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত এক অঙ্কে নেমে আসে। সর্বনিম্ন বেতন দেড় হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। ফলে অনুপাত দাঁড়ায় ১০:১। এটি ছিল বৈষম্য কমানোর দিক থেকে একটি বড় পদক্ষেপ।
এরপর আট বছর পর ২০০৫ সালে ষষ্ঠ পে কমিশন প্রণয়ন করা হয়। সর্বনিম্ন বেতন বাড়িয়ে করা হয় ২ হাজার ৪০০ টাকা (৬০% বৃদ্ধি) এবং সর্বোচ্চ বেতন দাঁড়ায় ২৩ হাজার টাকা (৫৩.৩৩% বৃদ্ধি)। এর ফলে অনুপাত নেমে আসে ৯.৫৮:১ এ। এই স্কেলও নিম্ন আয়ের কর্মীদের কিছুটা স্বস্তি দেয়, তবে বাস্তব বাজারদরের সঙ্গে তখনো ব্যবধান থেকে যায়।
২০০৯ সালে ঘোষিত সপ্তম পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন হয় ৪ হাজার ১০০ টাকা (৭০.৮৩% বৃদ্ধি) এবং সর্বোচ্চ বেতন হয় ৪০ হাজার টাকা (৭৩.৯১% বৃদ্ধি)। এতে অনুপাত বেড়ে দাঁড়ায় ৯.৭:১। অর্থাৎ, বৈষম্য কমার বদলে সামান্য বেড়ে যায়। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সে সময় বেশ সমালোচনা হয়েছিল।
অষ্টম পে কমিশন ঘোষিত হয় ২০১৫ সালে। এ স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ১০১.২২% বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৯৫% বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৭৮ হাজার টাকা। অনুপাত সামান্য কমে দাঁড়ায় ৯.৪৫:১। এই স্কেলকে অনেকেই তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ বললেও বাজারমূল্যের সঙ্গে মিল রেখে তা পর্যাপ্ত ছিল না বলে মন্তব্য করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা।
এখন নবম পে কমিশন নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। কর্মজীবী সংগঠনগুলো দাবি করছে, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত আরও কমিয়ে আনা হোক। কেউ কেউ প্রস্তাব দিয়েছেন, বৈষম্য ঘোচাতে গ্রেড সংখ্যা কমিয়ে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৪ করা প্রয়োজন।
অতএব, স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি পে কমিশনের মূল লক্ষ্য ছিল বেতন বৃদ্ধি এবং বৈষম্য হ্রাস। তবে বাস্তবে প্রতিবারই কিছুটা অগ্রগতি হলেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বৈষম্য কমানো সম্ভব হয়নি। এবার নবম পে কমিশনে যদি বাস্তবসম্মত সংস্কার আনা যায়, তবে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও হতাশা অনেকটাই লাঘব হতে পারে।
Leave a Reply