সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণার তোড়জোড় শুরু হতেই দেশে আবারও পুরনো এক বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এই বিতর্কের মূল কেন্দ্রে রয়েছে মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। সাধারণ মানুষের একাংশ মনে করছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়বে, ফলে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়বে এবং এর চাপ পড়বে সর্বসাধারণের ওপর। বিশেষ করে বেকার, দিনমজুর ও কৃষকরা এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে সরকারি চাকরিজীবীরা ভিন্ন এক বাস্তবতা তুলে ধরছেন। তাদের দাবি, গত এক দশকে প্রকৃত অর্থে তাদের বেতন কমেছে। ২০১৫ সালে একজন প্রথম শ্রেণির নতুন কর্মকর্তা ২২,০০০ টাকা বেসিক পেতেন, যা সে সময়ের ডলারের হিসাবে প্রায় ২৮২ ডলার সমমূল্যের ছিল। বর্তমানে একই বেতন দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৮০ ডলারে। অর্থাৎ, তাদের প্রকৃত বেতন কমেছে প্রায় ১০২ ডলার বা প্রায় ১২ হাজার টাকা। একই সময়ে বেসরকারি খাত বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে। অথচ সরকারি খাতের কর্মচারীদের বেতন উল্টো কমে যাওয়া তাদের কাছে বৈষম্যমূলক ও অমানবিক মনে হচ্ছে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিবছরের ইনক্রিমেন্ট। সরকারি চাকরিজীবীরা প্রতিবছর ৫% হারে বেতন বৃদ্ধি পেলেও বাস্তবে দেশে গড়ে ১০% হারে মুদ্রাস্ফীতি হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি বছর তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ৫% হারে কমছে। এভাবে দীর্ঘ এক দশক ধরে চলতে থাকায় সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রা সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে তারা মনে করছেন— বেতন না বাড়িয়ে অন্তত ২০১৫ সালের কাঠামোটিকে মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় করে বহাল রাখার প্রয়োজন আছে।
তবে বেতন বৃদ্ধির আলোচনায় আরেকটি বিতর্কিত যুক্তি প্রায়ই সামনে আসে— সেটি হলো সরকারি চাকরিজীবীদের ‘অবৈধ আয়ের সুযোগ’। সমালোচকেরা মনে করেন, দুর্নীতি ও অবৈধ আয় যেহেতু সরকারি খাতের অনেক জায়গায় বিদ্যমান, তাই বেতন বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু কর্মচারীরা এই ধারণাকে ‘অন্যায্য’ বলে মনে করেন। তাদের মতে, দুর্নীতি দমন করা সরকারের দায়িত্ব, কিন্তু সেই অজুহাতে সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মচারীদের বঞ্চিত করা অন্যায়। বরং যথেষ্ট বেতন-ভাতা নিশ্চিত করে দুর্নীতির সব ফাঁকফোকর বন্ধ করাই উচিত।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্নও উঠে আসছে— সরকার যখন নতুন পে-স্কেল প্রণয়ন করে, তখন কেন সাধারণ জনগণের মতামত নেওয়া হয়, অথচ বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বা ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রে কখনো জনগণের মতামত নেওয়া হয় না? সরকারি চাকরিজীবীদের দাবি, তারা নতুন কোনো সুবিধা চান না; শুধু ন্যায্য বেতন, যা মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় করলে অন্তত ন্যূনতম জীবনধারণ সম্ভব হয়।
তবে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে— বেতন বাড়লে যদি দ্রব্যমূল্য দ্বিগুণ গতিতে বাড়তে শুরু করে, তাহলে তার সুফল সরকারি চাকরিজীবীরাও পাবেন না। বরং সমাজের বৃহত্তর অংশ, যারা চাকরি করেন না বা নিম্ন আয়ের মানুষ, তারা মহাবিপদে পড়বেন। এতে সাধারণ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ আরও তীব্র হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সমন্বয়ের প্রশ্নে সরকারকে এক জটিল ভারসাম্যের পথ খুঁজতে হবে। একদিকে রয়েছে কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি, অন্যদিকে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতা। তাই জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫-এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— এমন একটি বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা, যা যুগোপযোগী হবে এবং যেখানে ন্যায্যতা, যুক্তি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা— তিনটিই সমন্বিতভাবে প্রতিফলিত হবে।
Leave a Reply