বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বাশিস) চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখার নবনির্বাচিত কমিটির পরিচিতি সভা ও বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে চট্টগ্রাম শহরের একটি রেস্টুরেন্টে এ সভার আয়োজন করা হয়। সভায় আসন্ন ৭ অক্টোবর রমনা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয়করণের দাবিতে মহাসমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়।
সভায় জানানো হয়, ওই মহাসমাবেশে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি প্রধান অতিথির বক্তব্য দেবেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাশিস প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কক্সবাজার জেলা সভাপতি মো. হোসাইনুল ইসলাম মাতব্বর। প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন বাকশিস চট্টগ্রাম জেলা সভাপতি উপাধ্যক্ষ মো. নুরুল আলম রাজু। উদ্বোধক ছিলেন বাকশিস জেলা সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. নাজিম উদ্দিন এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন অধ্যাপক আবু জাফর সিদ্দিকী।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাশিস চট্টগ্রাম উত্তর জেলা সভাপতি, বাশিস-কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও পোমরা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তৌহিদুল ইসলাম টিপু। সভা সঞ্চালনা করেন উত্তর জেলা সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির পাঠাগার সম্পাদক মো. মোবারক আলী। এ সময় নবনির্বাচিত উত্তরজেলা কমিটির নেতাদের পাশাপাশি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, শিক্ষকতা পেশা একটি মহান ব্রত। বাশিস শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের আন্দোলনের অগ্রদূত সংগঠন হিসেবে যুগপথ সংগ্রামের পথ দেখাচ্ছে। তারা অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়া ও জাকির হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয়করণের দাবিতে আগামী ৭ অক্টোবরের মহাসমাবেশ সফল করার আহ্বান জানান।
উপরে যে বিষয়গুলো এতক্ষণ জানলাম, তা নিয়ে খুব একটা কিছু বলার নাই কারণ ঐখানে যে বিষয়গুলো আলোকপাত করা হয়েছে তা যদি বাস্তবে ঘটে তাহলে অবশ্যই তা শিক্ষকদের ভাগ্যের যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটবে নিংসন্দেহে। কিন্তু প্রশ্ন যে জায়গায় করা যায় বা করতে ইচ্ছা জাগছে তা হলো যে ভদ্রলোক এই সমাবেশের ডাক দিয়েছেন, এবং যে সময় এই সমাবেশের ডাক দিয়েছেন সেই সময় নিয়ে।
প্রথমেই আসি, যে ভদ্রলোক এই সমাবেশের ডাক দিয়েছেন, তিনি এ দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত—এটা কারও অজানা নয়। এখানে আসলে দোষের কিছু নেই। প্রত্যেক ব্যক্তির রাজনৈতিক দর্শন থাকবে, এটা তার নাগরিক অধিকারও বটে। কিন্তু যখন সেই রাজনৈতিক দর্শন একজনের আদর্শকে কলুষিত করে ফেলে, তখন তা শুধু বিপদজনকই নয়, ভয়াবহও হয়ে ওঠে।
আরও বড় বিপদ তখনই ঘটে, যখন নিজের রাজনৈতিক দর্শনকে শক্তিশালী করার জন্য পেশাজীবী সমাজকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি নিছক স্বার্থপরতা নয়—এটি হলো এক নির্মম উদাহরণ, যেখানে একটি মহৎ পেশাকে ব্যক্তিগত স্বার্থের সিঁড়ি বানানো হয়। কেউ যদি নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য শিক্ষক সমাজকে ব্যবহার করে, তবে সেটি নিছক বিশ্বাসঘাতকতা নয়—এটি চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
মনে আছে গত বছর ঠিক ৫ আগষ্ট জাতীয় শিক্ষক দিবসে ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ার ইন্সটিউটে সারাদেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের মিথ্যা বলে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর সেখানে কি ঘটেছিল তা নিশ্চয়ই আর কারও অজানা নয়।
একবার নিজের মনেই প্রশ্ন করুন—একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কি সত্যিই কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের স্বার্থের পাহারাদার হয়ে উঠতে পারেন? চাকরি জাতীয়করণ হলে তার জীবনে কী পরিবর্তন আসবে? পেনশন কি বাড়বে? এমপিও কি আবার জীবিত হয়ে তার পকেটে যাবে? না, কিছুই হবে না। অথচ আজ তিনি কর্মরত শিক্ষকদের ভাগ্য নিয়ে এমন করে কাঁদছেন যেন সবকিছু হারিয়ে ফেলা এক অভিভাবক!
কথায় আছে, পৃথিবীতে বিনা স্বার্থে কেউ কারও উপকার করে না। আর এখানেও কি ব্যতিক্রম হবে? বিশ্বাস করুন, না। ইতিহাস বলে—এই সেই মহাশয়, যিনি ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় অবসর নেয়ার পর নিজের অবসর ও কল্যাণ তহবিল থেকে টাকা তুলেছিলেন ঠিক সেই সরকারের দোসরদের সঙ্গে আঁতাত করে। তখন তিনি খুব তৎপর ছিলেন, নিজের স্বার্থ রক্ষায়। অথচ একই সময়ে অবসর নেওয়া অসংখ্য শিক্ষক-কর্মচারী আজও তাদের পাওনা টাকা থেকে বঞ্চিত।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—যিনি নিজের সময় নিজের পাওনা তুলতেই ব্যস্ত ছিলেন, তিনি হঠাৎ আজ কর্মরত শিক্ষকদের ভাগ্যের কান্নায় কিভাবে ভিজে গেলেন? এটি কি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, নাকি পুরোনো নাটকের নতুন মঞ্চায়ন?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যখন এমপিওভুক্ত শিক্ষক সমাজ ইতোমধ্যেই একটি নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আন্দোলন করছে, তখন হঠাৎ নতুন দাবির পতাকা উড়ানোর কী এমন প্রয়োজন ছিল? এতে তো আন্দোলনের গতি ও ঐক্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শিক্ষক সমাজ এখন স্পষ্টভাবে জানে, কোন দাবিটি তাদের জন্য জরুরি এবং সেটিই সমগ্র এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অভিন্ন দাবি। সেখানে নতুন প্রসঙ্গ টেনে এনে বিভ্রান্তি তৈরি করার মানে কী?
যদি সত্যিই এই ভদ্রলোক এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ হতেন, তবে গত ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনার পর থেকেই তিনি কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতেন। এমন উদ্যোগ, যা শিক্ষক কর্মচারীদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি কিছুই করেননি। বরং ব্যস্ত থেকেছেন একেবারেই অন্য খাতে—কিভাবে নানান দাবি-দাওয়ার বিষয়ে জটিলতা তৈরি করা যায়, এবং কিভাবে অবসর ও কল্যাণ বোর্ডের মোটা দাগের কোনো পদ নিজের হাতে নেওয়া যায়।
অর্থাৎ শিক্ষক সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি যতটা ভাবেন না, তার চেয়ে অনেক বেশি ভাবেন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে। শিক্ষকদের দাবিকে সামনে রেখে আসলে তিনি নিজের ভাগ্যের তাস খেলতে চান। প্রশ্ন হলো—এই ধরনের স্বার্থপর নেতৃত্বকে আমরা কতটা বিশ্বাস করতে পারি?
পরিশেষে একটি কথাই বলব—আগামী ৭ অক্টোবরের কর্মসূচিতে কে যাবেন আর কে যাবেন না, তা সম্পূর্ণই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তবে আমরা যারা চাকরি করি, তারা এতটুকু বুঝতে পারি—কোনটি আমাদের জন্য মঙ্গল আর কোনটি অমঙ্গল। কোথায়, কখন, কোন সময়ে আমাদের থাকা প্রয়োজন, সেটাও আমরা ভালোভাবেই জানি।
তবে যারা এই সমাবেশ আয়োজন করছেন, সেই সংগঠন ও নেতাদের উদ্দেশে একটি সতর্কবার্তা—আপনারা যদি সত্যিই এমপিওভুক্ত শিক্ষক সমাজের ভাগ্যের উন্নয়ন চান, তাহলে আমাদের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে থাকুন। শিক্ষকদের অভিন্ন দাবিকে শক্তিশালী করুন। এমন কোনো উসকানিমূলক কাজ করবেন না, যাতে আমাদের উন্নয়নের স্বপ্ন ভেঙে পড়ে এবং উল্টো অবনমন ঘটে।
মনে রাখবেন, আপনারা যদি শিক্ষকদের দাবি-দাওয়াকে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নের হাতিয়ার বানান, যদি এই সমাবেশ কেবল আপনাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের মঞ্চ হয়ে ওঠে, তবে শিক্ষক সমাজ আপনাদের কখনও ক্ষমা করবে না। ইতিহাস খুব নির্মম—যারা শিক্ষক সমাজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাদের জায়গা থাকে শুধু নিন্দার কাতারে।
Leave a Reply