বাংলাদেশের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই বেসিক সাবজেক্টে শিক্ষক সংকট বিরাজ করছে। এই ৮টি বিষয় হলো—অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, ফরেনসিক মেডিসিন, কমিউনিটি মেডিসিন, ফার্মাকোলজি, মাইক্রোবায়োলজি ও প্যাথলজি। এসব বিষয়ে শিক্ষকদের জন্য চাকরির পাশাপাশি কোনো ধরনের প্র্যাকটিস বা স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে চিকিৎসকরা এ বিষয়গুলোতে পড়াশোনা করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন, কারণ এখানে শিক্ষাদান ছাড়া বিকল্প কোনো পেশাগত পথ খোলা থাকে না। এ অবস্থার কারণে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে এ আট বিষয়ে একের পর এক পদ খালি পড়ে আছে, যা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। সেখানে কিউরেটর ও লেকচারারসহ বেসিক সাবজেক্টে মোট ২ হাজার ১৫৫টি অনুমোদিত পদ রয়েছে। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ১ হাজার ৬২৪ জন শিক্ষক। অর্থাৎ এখনো ৫৩১টি পদ শূন্য পড়ে আছে, যা মোট পদের প্রায় ২৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ শূন্যতা শুধু শিক্ষাদান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রেও গুরুতর প্রভাব ফেলছে।
শিক্ষক সংকট নিরসনে সরকার প্রথম উদ্যোগ নেয় ২০১৯ সালে। তখন থেকে বেসিক সাবজেক্টের শিক্ষকদের জন্য গ্রেডভিত্তিক প্রণোদনা চালু হয়। এর আওতায় নবম গ্রেডে কর্মরত শিক্ষকরা পান মাসিক ১০ হাজার টাকা, অষ্টম গ্রেডে ১১ হাজার, সপ্তম গ্রেডে ১৩ হাজার, ষষ্ঠ গ্রেডে ১৫ হাজার, পঞ্চম গ্রেডে ১৬ হাজার, চতুর্থ গ্রেডে ১৮ হাজার এবং তৃতীয় গ্রেডে কর্মরত শিক্ষকরা পান ২০ হাজার টাকা প্রণোদনা।
পরে অ্যানেস্থেসিওলজি ও ভাইরোলজির শিক্ষকরাও এই প্রণোদনার আওতায় আসেন। যদিও এই দুটি বিষয়কে বেসিক সাবজেক্ট হিসেবে ধরা হয় না, তবে এ ক্ষেত্রেও শিক্ষকদের চিকিৎসা সেবার সুযোগ সীমিত। ফলে তাদেরও প্রণোদনার আওতায় আনা হয়।
২০২৫ সালের শুরুতে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর একটি বড় উদ্যোগ নেয়। তারা প্রস্তাব করে, বেসিক সাবজেক্টের শিক্ষকদের গ্রেডভিত্তিক নির্ধারিত অর্থের পরিবর্তে মূল বেতনের ১০০ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হোক। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরও প্রস্তাবে সম্মতি জানায়।
কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় এই প্রস্তাবে আপত্তি জানায়। তাদের যুক্তি ছিল, দেশের বর্তমান আর্থিক সংকটের মধ্যে এত বড় অঙ্কের প্রণোদনা দেওয়া সম্ভব নয়। এরপর আলোচনার প্রেক্ষিতে গত জুলাই মাসে অর্থ মন্ত্রণালয় ৫০ শতাংশ হারে প্রণোদনার অনুমোদন দেয়। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও কিছুটা বাড়ানোর সুপারিশ করে। অবশেষে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রণোদনার হার ৭০ শতাংশে উন্নীত করার অনুমোদন দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। শিগগিরই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হবে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) অধিভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রেসিডেন্সি ও নন-রেসিডেন্সি বেসরকারি প্রশিক্ষণার্থীরা মাসিক ৩৫ হাজার টাকা ভাতা পান। কিন্তু সরকারি প্রার্থীদের জন্য এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে সরকারি চাকরিজীবী চিকিৎসকরা বেসিক সাবজেক্টে পড়াশোনা করতে অনাগ্রহী। তারা সাধারণত এমন বিষয় বেছে নেন যেখানে প্র্যাকটিস বা অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ থাকে।
এ পরিস্থিতি বদলাতে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর প্রস্তাব করেছে—যেসব সরকারি চিকিৎসক বিএমইউ অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানে বেসিক সাবজেক্টে পড়াশোনা করবেন, তাদেরকে অধ্যয়নকালীন মাসিক ২০ হাজার টাকা প্রণোদনা দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সম্মতি দিলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এখনও বাকি। যদি এটি অনুমোদিত হয়, তবে সরকারি চিকিৎসকরাও বেসিক সাবজেক্টে পড়াশোনায় উৎসাহী হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হোসেন বলেন,
“আমরা প্রথমে মূল বেতনের শতভাগ প্রণোদনার প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু সরকারের আর্থিক অবস্থার কারণে অর্থ মন্ত্রণালয় এতে সম্মতি দেয়নি। তারা প্রথমে ৫০ শতাংশ প্রস্তাব করে। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে এটি ৭০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আশা করছি, শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি হবে।”
তিনি আরও বলেন,
“সরকারি প্রার্থীদের জন্য আমরা মাসিক ২০ হাজার টাকা প্রণোদনার প্রস্তাব দিয়েছি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এতে সম্মতি দিয়েছে। এখন কিছু সংশোধনের কাজ চলছে। যদি এটি অনুমোদিত হয়, তাহলে সরকারি প্রার্থীরা বেতনের পাশাপাশি প্রণোদনাও পাবেন। এতে বেসিক সাবজেক্টে পড়াশোনার আগ্রহ বাড়বে বলে আমরা মনে করছি।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন এই উদ্যোগ কার্যকর হলে মেডিকেল কলেজে শিক্ষক সংকট অনেকটা কমে আসবে। সরকারি প্রার্থীদের জন্যও যখন প্রণোদনা কার্যকর হবে, তখন চিকিৎসকরা আর বেসিক সাবজেক্টকে এড়িয়ে যাবেন না। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীরা সঠিক সময়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা পাবেন, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের সংকটও নিরসন হবে।
Leave a Reply