বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি নীতিমালায় আবারও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে আদালতে চলমান মামলা এবং শিক্ষকদের দাবির প্রেক্ষাপটে নীতিমালার কিছু ধারা সংশোধনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। সূত্র জানায়, চলমান সমস্যাগুলো নিরসন না করা পর্যন্ত এবং সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত কার্যত বদলি কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে না।
২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর (বুধবার) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ইনডেক্সধারী সকল শিক্ষককে বদলির আওতায় আনার জন্য ইতোমধ্যে আদালতে একটি রিট করা হয়েছে। এ রিটের নিষ্পত্তি না হলে বদলি কার্যক্রম আইনগত জটিলতায় পড়ে যাবে। তাই সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত কোনোভাবেই বদলি কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব নয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “শিক্ষকদের বদলি নীতিমালা বর্তমান আকারে কার্যকর করা কঠিন। পরিবর্তন ছাড়া এটি চালু করা সম্ভব নয়। যেহেতু নীতিমালা সংশোধন করতেই হবে, তাই শিক্ষকদের আরও কিছু দাবি ও প্রস্তাব সেখানে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
নীতিমালা সংশোধন করতে দীর্ঘ সময় লাগবে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি আরও বলেন, “নীতিমালা সংশোধন মূলত খুব বেশি সময়সাপেক্ষ নয়। বিলম্ব হতে পারে কেবল সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত পাওয়ার ক্ষেত্রে। একবার অনুমতি পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ সাত কার্যদিবসের মধ্যেই সংশোধিত নীতিমালা কার্যকর করা সম্ভব।”
এদিকে বদলি কার্যক্রমে ব্যবহারযোগ্য সফটওয়্যার নিয়েও নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সূত্রে জানা যায়, শিক্ষকদের বদলির জন্য কোনো প্রকার দরপত্র ছাড়াই একটি ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি বিনামূল্যে সফটওয়্যার সরবরাহ করে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৪৫টি স্কুল-কলেজ থেকে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ট্রায়াল চালায়। ট্রায়াল সফল হলেও সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে তা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
মাউশির এক কর্মকর্তা বলেন, “ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চাইছিল। কিন্তু বদলি একটি অতি গোপনীয় ও সংবেদনশীল কার্যক্রম। এখানে তথ্যের অপব্যবহার ও অনিয়মের সুযোগ থাকে। তাই কোনো বাইরের প্রতিষ্ঠানের হাতে শিক্ষকদের বিপুল তথ্য তুলে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এজন্য আমরা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিয়ে নতুন করে সফটওয়্যার তৈরি করার পরিকল্পনা নিয়েছি। এ প্রক্রিয়া শুরু করতে হলে যাবতীয় কাজ আবার নতুনভাবে শুরু করতে হবে।”
শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও বাস্তবে অনেকেই দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে থেকে যান। এনটিআরসিএ কর্তৃক সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দীর্ঘ সময় ধরে একই স্থানে অবস্থান শিক্ষকতার পেশাগত বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষক বদলি কার্যক্রম চালু হলে শিক্ষকরা ন্যায্য সুযোগ পাবেন এবং শিক্ষা কার্যক্রমও গতিশীল হবে। এ উদ্দেশ্যে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বদলির ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। কিন্তু সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জটিলতা এবং নীতিমালার সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা কার্যক্রমকে স্থবির করে দিয়েছে।
বদলি কার্যক্রম চালু না হওয়ায় শিক্ষক সমাজ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, সফটওয়্যার নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং নীতিমালা সংশোধনের অজুহাত প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতার প্রকাশ। শিক্ষকদের মতে, সরকার চাইলে দ্রুত এই সমস্যা সমাধান করে বদলি কার্যক্রম শুরু করতে পারে। তারা স্বচ্ছতা ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বদলি কার্যক্রম চালুর দাবি জানাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, বদলি নীতিমালা অনুযায়ী গত ১৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শূন্যপদের তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর নির্ধারিত সময়ে সেই কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারেনি। ফলে শিক্ষক বদলি প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
Leave a Reply