বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটলেও শিক্ষক-কর্মচারীদের ন্যূনতম নিরাপত্তা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই নন-এমপিওভুক্ত। বর্তমানে দেশে বেসরকারি খাতে ৯২ হাজার ৩৯২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। এর মধ্যে মাসিক পে-অর্ডার (এমপিও) সুবিধাভুক্ত প্রতিষ্ঠান মাত্র ২৬ হাজার ১০৪টি। বাকিগুলো—অর্থাৎ ৬৬ হাজার ২৮৭টি প্রতিষ্ঠান—এমপিও সুবিধার বাইরে রয়েছে। এর মানে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশ এমপিওভুক্ত নয়।
এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, যা সরাসরি শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠদানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—
অন্যদিকে দেশে ৬ হাজার ৫৮৭টি কোচিং সেন্টারও সক্রিয় রয়েছে, যেগুলো মূল পাঠ্যক্রমে শিক্ষা কার্যক্রম চালায় না, বরং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা করে।
নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরা মূলত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও টিউশন ফি-এর ওপর নির্ভর করে বেতন পান। ছাত্রসংখ্যা কমে গেলে তাদের আয়ও কমে যায়। অনেক শিক্ষক মাস শেষে ন্যূনতম জীবনধারণের মতো অর্থও পান না। ফলে তারা হতাশায় ভোগেন, বিকল্প জীবিকার পথ খোঁজেন বা বাধ্য হয়ে অনাগ্রহ নিয়ে ক্লাস নেন। এতে শিক্ষার্থীরা মানসম্পন্ন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। আর এর দীর্ঘমেয়াদী ভোগান্তির ও ক্ষতির শিকার কিন্তু হচ্ছে এ রাষ্ট্র।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এসএম হাফিজুর রহমান মনে করেন, “বেসরকারি শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করতে হবে। একইসঙ্গে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—শিক্ষকদের যোগ্যতা যাচাই ও ধাপে ধাপে এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন।” পাশাপাশি যে সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন বা আগামীতে হবেন বা যারা আগামীতে এই পেশায় আসবে তাদের পরিপূর্ণ আর্থিক নিশ্চয়তা বিধানের দায়িত্ব এ রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। রাষ্ট্র যদি আর্থিক নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হন তাহলে কিন্তু মেধাবিরা এই পেশার প্রতি আগ্রহ হারাবে। আর মেধাবিরা যদি আগ্রহ হারায় তাহলে কিন্তু শিক্ষার মান নিম্নমুখী হতে বাধ্য।
নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকট শুধু শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর নয়—এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
১. সাংবিধানিক দায় → সংবিধানে শিক্ষা মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ আছে। তাই নন-এমপিও শিক্ষকদের দুরবস্থা রাষ্ট্র উপেক্ষা করতে পারে না।
২. নীতিগত দায় → অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ, ধাপে ধাপে এমপিওভুক্তি ও সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
৩. আর্থিক দায় → বাজেটভিত্তিক পরিকল্পনা, বিশেষ তহবিল বা ভর্তুকির মাধ্যমে এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিও সকল শিক্ষকদের ন্যূনতম জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. মান নিয়ন্ত্রণের দায় → শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা না দিলে শিক্ষার মান রক্ষা করা সম্ভব নয়।
৫. বাস্তব দায় → দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানে পড়ছে। তাই এ খাতকে অবহেলা করলে জাতীয় শিক্ষার সমতা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন ব্যাহত হবে।
বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় অংশ এখনো নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু শিক্ষকরা যখন আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় থাকবেন, তখন শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা পাবে না। তাই রাষ্ট্রের উচিত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মূল স্রোতে আনা, ধাপে ধাপে এমপিওভুক্ত করা এবং ন্যূনতম আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি এটাও দেখতে হবে যেখানে সেখানে কারও ব্যাক্তি স্বার্থের জন্য যেখানে সেখানে যেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠে। এটার দায়ভারও কিন্তু এ রাষ্ট্রেরই। শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত দায় নয়—এটি রাষ্ট্রেরও সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
Leave a Reply