এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা আজীবন একটি পেশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও তাদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে যেন কারো মাথাব্যথা নেই। রাষ্ট্রের বিবেকবান সুশীল সমাজের কাছ থেকেও তারা পাননি প্রত্যাশিত সমর্থন। অথচ এই শিক্ষক কর্মচারীরাই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম আলোকিত মানুষ তৈরি করে যাচ্ছেন।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, যেসব আমলা এই খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত—তাদের অনেকের মনোভাবই প্রশ্নবিদ্ধ। প্রায়শই দেখা যায়, তারা চিন্তা করেন কিভাবে এই শিক্ষক কর্মচারীদের দাবিগুলো আটকে দেওয়া যায়, কিংবা কিভাবে তাদের ঠকানো সম্ভব। এ কারণে কখনও ভাড়া করা সংগঠনের নেতা কিংবা সুবিধাভোগী কয়েকজন নেতাকে সামনে ঠেলে দিয়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের যৌক্তিক আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা হয়। এতে করে আন্দোলনের গতি কমে যায়, অথচ মূল সমস্যার সমাধান অধরাই থেকে যায়।
তবে সাম্প্রতিক আন্দোলনের ফলে কিছুটা হলেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। গত ১৩ তারিখের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিগতভাবে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতা বৃদ্ধিতে সম্মত হয় এবং শিক্ষক নেতাদের কাছে হিসাব দাখিল করতে বলে। জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের নেতৃবৃন্দ ২০ তারিখে সেই হিসাব মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে মাউশিকে নির্দেশ দেওয়া হয় কত পরিমাণ ব্যয় প্রয়োজন তা টেবিল আকারে তৈরি করতে। মাউশি অনেক গড়িমসি করার পর সেই হিসাব গত সপ্তাহে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে। কিন্তু মাউশি যে হিসাব প্রেরণ করে সেখানে সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের হিসাব না থাকায় সেটি নিয়ে আর সামনে অগ্রসর হওয়া যায় নি। কারণ সেখানে আরও দুইটি অধিদপ্তরের আওতাধীন শিক্ষক কর্মচারীদের হিসাব যুক্ত করা নাই।
কিন্তু সমস্যার জায়গা ছিল অন্য দুই অধিদপ্তরে। মাদ্রাসা ও কারিগরি অধিদপ্তরের কাছে এ সংক্রান্ত কোনো হিসাব চাওয়া হয়নি বা হিসাব চেয়ে যে চিঠি প্রেরণ করতে হয় তা পাঠনো হয়নি যে চিঠি একসাথে তিন অধিদপ্তরে পাঠানো যায় তা পাঠানো হল ১০/১২দিন পর। ইচ্ছাকৃতভাবে জটিলতা তৈরি করা। পরবর্তীতে সেই চিঠি গত ১৪ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রেরণ করা হয় এবং বলা হয় তাদের যে কি পরিমাণ টাকার প্রয়োজন হবে তার হিসাব প্রস্তুত করতে। সেই নির্দেশে তারা ১৫ সেপ্টেম্বর মাউশির কাছে হিসাব প্রেরণ করেছে। এখন আশা করা হচ্ছে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ও চিকিৎসাভাতার জন্য কত অর্থ প্রয়োজন হবে তার একটি যৌথ হিসাব এই সপ্তাহের মধ্যেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, এর আগে মাউশি শুধু স্কুল ও কলেজের হিসাব পাঠিয়েছিল। কিন্তু এবার সবকটি অধিদপ্তরের হিসাব একত্রিত করে প্রেরণ করা হবে। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি নিয়ে মিটিং হবে, যেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাড়িভাড়া ও চিকিৎসাভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব ডিও লেটারের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
এখন প্রশ্ন হলো—এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া কত দ্রুত শেষ হবে এবং শিক্ষক কর্মচারীরা কবে থেকে বাস্তব সুফল পাবেন? অতীতে অনেকবারই আন্দোলন, প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাসের চক্রে শিক্ষক কর্মচারীরা ক্লান্ত হয়েছেন। তাই এবার তাদের প্রত্যাশা, যেন এই প্রতিশ্রুতি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে রূপ পায়।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা কেবল তাদের ব্যক্তিগত প্রাপ্তির বিষয় নয়; বরং এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পূর্বশর্ত। রাষ্ট্র ও নীতি-নির্ধারকদের উচিত হবে এ বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা এবং দ্রুততম সময়ে সুনির্দিষ্ট সমাধান নিশ্চিত করা।
Leave a Reply