দেশের বেসরকারি স্কুল-কলেজের প্রায় পাঁচ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা, ত্রুটি ও অসঙ্গতির কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, ফলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। একটানা বেতন না পাওয়ায় অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পরিবারের ভরণ-পোষণ, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার খরচ মেটাতে তারা ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (ইএমআইএস) সেলের প্রোগ্রামার মো. জহির উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেন, “বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও বহু শিক্ষক-কর্মচারী এখনো তাদের তথ্য হালনাগাদ করেননি। এ কারণে তারা ইএফটির (ইলেকট্রনিক ফান্ডস ট্রান্সফার) আওতায় বেতন পাচ্ছেন না। যতদিন না তারা সঠিকভাবে তথ্য সংশোধন করছেন, ততদিন বেতন-ভাতা চালু হবে না।”
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বহুদিন ধরেই ইএফটির মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। কিন্তু বেসরকারি স্কুল-কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা আগে রাষ্ট্রায়ত্ত আটটি ব্যাংকের মাধ্যমে পুরনো বা ‘অ্যানালগ’ পদ্ধতিতে বেতন-ভাতা উত্তোলন করতেন। এতে তাদের বারবার ব্যাংকে যেতে হতো, অনুমোদনের ধাপ পেরোতে হতো এবং প্রায়ই দীর্ঘ বিলম্বের শিকার হতে হতো। অনেকে আগের মাসের বেতনও ১০ তারিখ পার হয়ে গিয়ে হাতে পেতেন।
এই দীর্ঘ ভোগান্তি লাঘব করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবসে, ঘোষণা দেয় যে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্ত বেতন-ভাতা ইএফটির মাধ্যমে প্রদান করা হবে। পরবর্তী ধাপে ধাপে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে ইএফটির আওতায় আনা হলেও এখনো প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী এই সুবিধার বাইরে রয়েছেন।
ইএমআইএস সেলের তথ্য অনুযায়ী, একাধিক প্রতিষ্ঠানে একই শিক্ষক বা কর্মচারীর নাম এমপিও তালিকায় থাকার মতো গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্টদের বেতন বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া ভুল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর দেওয়া, ব্যাংক তথ্য হালনাগাদ না হওয়া কিংবা এমপিও শিটে থাকা তথ্যের সঙ্গে ব্যাংক হিসাবের তথ্য না মেলার কারণেও অনেকের বেতন বন্ধ রয়েছে।
এখানে একটি বড় প্রশ্ন দেখা দেয়—এই শিক্ষকরা তো অতীতে নিয়মিত বেতন পেতেন, কিন্তু এখন পাচ্ছেন না কেন? অনিয়ম যদি থেকে থাকে, তা নতুন নয়; বরং বহু বছর ধরেই চলে আসছে। তাহলে এতদিন তারা বেতন পেলেন কীভাবে? বাস্তবতা হলো, এসব অনিয়মে শুধুমাত্র শিক্ষকরা জড়িত নন; মাউশির কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতা ছাড়া এই ধরনের ডাবল এমপিও বা ভুয়া তথ্য হালনাগাদ সম্ভব নয়। অথচ আজ বেতন বন্ধ করে কেবলমাত্র শিক্ষকদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু প্রশাসনের ভেতরের সহযোগী চক্রের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে যেসব শিক্ষকের একাধিক এমপিও রয়েছে, তাদের সঙ্গে মাউশির দুর্নীতিবাজ একটি মহলের যোগসাজশ বহুদিন ধরেই রয়েছে। অভিযোগ আছে, এই চক্র প্রতি মাসে অবৈধ সুবিধা আদায় করে থাকে। তাহলে প্রশ্ন উঠছে—কেবল শিক্ষকরা কেন ভোগান্তিতে পড়বেন, আর যারা সহযোগিতা করেছে তারা কেন শাস্তির বাইরে থাকবে?
সূত্র আরও জানিয়েছে, জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) দেওয়া নাম এবং এমপিও শিটে থাকা নামের মধ্যে বড় ধরনের অমিল পাওয়া গেছে। অনেকের এনআইডিতে পূর্ণ নাম উল্লেখ থাকলেও এমপিও শিটে সংক্ষিপ্ত নাম বা বানানের ভিন্নতা রয়েছে। এর ফলে ইএফটির মাধ্যমে বেতন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই জাতীয়করণ হয়েছে, তাদের শিক্ষক-কর্মচারীরা এমপিও তালিকায় থাকলেও জাতীয়করণের পর থেকে আর এমপিওভুক্ত হিসেবে বেতন পাচ্ছেন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইএমআইএস সেলের এক কর্মকর্তা বলেন, “ভুল ব্যাংক হিসাব নম্বর দেওয়া শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। নামের ভিন্নতা ও ভুলের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ডাবল এমপিও এবং জাতীয়করণের কারণেও অনেকে বেতন পাচ্ছেন না। এগুলো সংশোধনের দায়িত্ব শিক্ষকদেরই। সংশোধন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ইএফটির মাধ্যমে তাদের বেতন দেওয়া সম্ভব নয়।”
পুরো বিষয়টি দেখলে বোঝা যায়, এখানে শুধু শিক্ষক-কর্মচারীদের অবহেলা বা অনিয়ম নয়, বরং মাউশির ভেতরের দুর্নীতিবাজ চক্রেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। অথচ শাস্তি ও ভোগান্তির বোঝা বইতে হচ্ছে একমাত্র শিক্ষকদেরই।
Leave a Reply