এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের হিসাব করতে সময় বেশি লাগে, তবে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে তা দ্রুত হয় কেন? — একটি গঠনমূলক বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হচ্ছে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীরা। তারা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন পেলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো নির্ধারিত তারিখে বেতন পান না। এদের বেতন প্রদানে প্রায়ই দীর্ঘসূত্রতা, বিলম্ব ও প্রশাসনিক জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। আজ এই সমস্যা তো আগামীকাল অন্য আর এক সমস্যা, প্রতিনিয়ত কোন না কোন কারণে, কোন না কোন কারণ লেগে থাকেই এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন প্রদানে। এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন প্রদান কারী অধিদপ্তর গুলো যেন কারণ তৈরি করে তার প্রয়োগ করার জন্য খুব ব্যস্ত। এই ব্যস্ততা যদি এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন প্রদানের অজুহাত তৈরি করার পিছনে না ব্যয় না করে যদি অজুহাত মেটানোর কাজে ব্যয় করত আফসোস তাহলে আজ এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের এই অবস্থায় দাঁড়াতে হতো না। একই দেশে একই পেশায় চাকুরী করে অথচ সরকারী শিক্ষক কর্মচারীদের কোন কারণে কোন মাসেই বেতন প্রদানে নূর্ণ্যতম দেরি হয়না, প্রতিনিয়ত সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নির্ধারিত তারিখে নিয়মিতভাবে পৌঁছে যায়। অথচ এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের বেলায় এই বৈষম্য শিক্ষক সমাজে হতাশা সৃষ্টি করে এবং শিক্ষা কার্যক্রমে পরোক্ষ প্রভাব ফেলে।
গতকাল মাদ্র্রাসা অধিদপ্তর হতে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আগামী জুলাই মাসের বেতনে যেহেতু সরকার ঘোষিতই সরকারী চাকুরীজিবীদের ন্যায় এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদেরও বিশেষ সুবিধা ও বার্ষিক বৃদ্ধির আওতায় বেতন বৃদ্ধি ঘটবে তাই হিসাব নিকাশ করার জন্য অতিরিক্ত ৫-৭ দিন সময় প্রয়োজন। এখানে প্রশ্ন হলো এই যে, হিসাব নিকাশ কি শুধু এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য নাকি সরকারী চাকুরীজীবিদের বেতন প্রদানে কোন হিসাব নিকাশ করা লাগে না। চাকুরী কি শুধু সরকারী শিক্ষকরা বা সরকারী অন্যান্য কাজে নিয়োজিত কর্মজীবিরা করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা কি করে না। তাদের বেলায় কেন এত বৈষম্য। এদেশের শিক্ষার কথা যদি বলা হয় তাহলে কিন্তু শতকরা ৯৫ভাগ দায়িত্ব কিন্তু এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরাই করে থাকে। অথচ যারা ৫% দায়িত্ব পালন করে সময় মতো বেতন ভাতা পায় আর যারা ৯৫% দায়িত্ব পালন করে তাদের বেতন প্রদানে প্রতিমাসে কোন না কোন বাহানা তৈরি করাই থাকে।

এতক্ষণ জানালাম এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের একটি অংশবিশেষ এর কথা এখন একটু আলোচনা করব এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের একটি বড় অংশের কিছু সমস্যা নিয়ে-
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ইএফটির মাধ্যমে বেতন-ভাতা পান। তবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগার থেকে ছাড় হলেও তা রাষ্ট্রায়ত্ত আটটি ব্যাংকের মাধ্যমে ‘অ্যানালগ’ পদ্ধতিতে ছাড় হতো। এই অর্থ তুলতে শিক্ষকদের নানা ভোগান্তিতে পড়তে হতো।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ইএফটিতে বেসরকারি শিক্ষকদের এমপিওর বেতন-ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের ২০৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অক্টোবর মাসের এমপিও ইএফটিতে ছাড় হয়। পরবর্তী সময়ে গত ১ জানুয়ারি ১ লাখ ৮৯ হাজার শিক্ষক ইএফটির মাধ্যমে বেতন-ভাতার সরকারি অংশের টাকা পেয়েছেন। তবে এখনো আজ অবধি এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক কর্মচারীদের প্রায় ১০ হাজারের অধিক ইএফটির মাধ্যমে বা কোন মাধ্যমেই জানুয়ারী থেকে বেতন পাননি। বেতন না পেয়ে তারা আর্থিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে রয়েছেন।
এখানে প্রশ্ন হলো যে, সরকারী শিক্ষক কর্মচারীরাও তো ইএফটির মাধ্যমে বেতন পান তারাও কি এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের ন্যায় এরূপ ভোগান্তির সম্মুখীন হয়েছিলেন? উত্তর আমার মনে হয় আপনারা সকলেই জানেন তারপর বলছি উত্তর না। কিন্তু তাহলে কেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের বেলায় এমন ভোগান্তি?
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পরিশোধ একটি আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির মাধ্যমে হয়ে থাকে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত সফটওয়্যার যেমন iBAS++, IFMS ইত্যাদি ব্যবহারের ফলে তাদের বেতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত তারিখে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে যায়। সেখানে ব্যক্তিগত ছুটি, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধাগুলো সফটওয়্যারেই পূর্বনির্ধারিত থাকে, ফলে প্রশাসনিক দেরির সুযোগ থাকে না।
অন্যদিকে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন পেতে হলে প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে মাসিকভাবে বেতন বিল প্রস্তুত করছে বর্তমানে মাউশির ইএমআইএস সেল তারপর সেই বেতনের হিসাব মাউশির হিসাব শাখা হয়ে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের হিসাব শাখায় পৌছায় সেখান হতে অনুমোদন শেষে বেতন বিল পৌছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে সেখান হতে অনুমোদন শেষে প্রধান হিসাব রক্ষকের অফিসে। সেখান হতে যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকট অর্থ বরাদ্দের জন্য সেখান হতে যায় আইবাস++ কর্তৃপক্ষের নিকট সেখান হতে বেতন শিক্ষক কর্মচারীর নিজ নিজ ব্যাংক একাউন্টে পোষ্টিং হয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় কোনো একটি স্তরে সামান্য ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে অসঙ্গতিও পুরো প্রক্রিয়ায় দেরি ঘটাতে পারে। অনেক সময় সফটওয়্যারের সীমাবদ্ধতা, ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নজরদারির ঘাটতি বিলম্বের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এখানে আর একটি গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার রয়েছে যা এই মাসের শুরুতেই মাউশি কর্তৃপক্ষ নিজেই বলেছে যে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য যে ইএফটির প্রচলন করা হয়েছে সেটি আসলেই সরকারীদের জন্য পরিচালিত ইএফটির মতো নয়। সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য ইএফটিতে প্রতিমাসে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না কিন্তু এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের বেলায় যেটি দরকার হয়। যার কারণে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন প্রদানে এই দীর্ঘসূত্রতা।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের তথ্য ব্যবস্থাপনা এখনো পুরোপুরি অটোমেটেড হয়নি। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত তথ্য, পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট, বদলি(অংশবিশেষে এর জন্য তবে এখনও চালু হয়নি যা আগামী সেপ্টেম্বর থেকে পরীক্ষামুলক চালু হবে) ইত্যাদি বিষয় অনেকটা ম্যানুয়ালভাবে বা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে হালনাগাদ করতে হয়। এতে সময় লাগে এবং ভুলত্রুটির সম্ভাবনাও থাকে। সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রেও এসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না, তবে তা কেন্দ্রীয়ভাবে একবারই সফটওয়্যারে আপডেট হয়, যা দ্রুত এবং সুনির্দিষ্ট।
এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য একটি একীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা জরুরি, যেখানে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন সংক্রান্ত সকল তথ্য সংরক্ষিত থাকবে এবং বিল তৈরি হবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। তৃতীয়ত, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেতন না দিলে তাৎক্ষণিক অভিযোগ ব্যবস্থা ও বিল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে, যাতে দেরির উৎস সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়।
শিক্ষকদের নিয়মিত ও সময়মতো বেতন প্রদান শুধুমাত্র একটি আর্থিক বিষয় নয়, এটি একজন শিক্ষকের আত্মমর্যাদা, মানসিক স্বস্তি এবং শ্রেণিকক্ষে তার মনোযোগের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। শিক্ষক যদি মাসের পর মাস বেতন নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের প্রতি তার মনোযোগও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই, সরকারের উচিত হবে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী করে তোলা, যাতে তাদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি হয় এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক মানোন্নয়ন সম্ভব হয়।
Leave a Reply