বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ হলো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। তাঁরা দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছেন। অথচ, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে ‘বিশেষ সুবিধা’ বা ‘Substantive Grade’ ভিত্তিক অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা চালু হয়েছে, তার আওতায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা অন্তর্ভুক্ত নন। এটি শুধু একটি আর্থিক বৈষম্য নয়, বরং এটি একটি নীতিগত বৈষম্য এবং মূল্যায়নহীনতার প্রতিচ্ছবি।
প্রথমে আমাদের জানা দরকার Substantive Grade কি? Substantive Grade বলতে সাধারণত সরকারি চাকরিতে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী তাঁর স্থায়ী পদমর্যাদা অনুযায়ী প্রাপ্ত মূল বা প্রকৃত পদবি বা পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত অবস্থানকে বোঝানো হয়। এটি কোনো অস্থায়ী বা কার্যভারপ্রাপ্ত (acting) পদ নয়, বরং সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষা বা যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে বা বিধিমালার অনুসরণে স্থায়ীভাবে প্রদত্ত পদ। এটি ইংরেজিতে “Substantive Post” বা “Substantive Rank” নামেও পরিচিত। আরও যদি স্বাভাবিক বা প্রচলিত ভাবে বোঝাতে চাই Substantive Grade হলো সেটি যে বেতন গ্রেডটি আমরা প্রথম এমপিওভুক্ত হওয়ার সময় পেয়েছিলাম সেটা। অর্থাৎ আপনি যদি প্রথমে ১০ বা ১১ নং গ্রেডে যোগদান করেছেন কিন্তু এখন টাইম স্কেল ও উচ্চতর স্কেল পেয়ে ৯ বা ৮ নং গ্রেডে উন্নীত হয়েছেন তাহলে আপনার Substantive Grade হবে ঐ ১০ নং বা ১১ নং গ্রেড। এখন এই বিষয়ের গুরুত্ব কি? কেনই বা এই বিষয় নিয়ে এখন বৈষমের কথা বলছি। বলার কারণ হল সরকারী কর্মচারী ও কর্মকর্তারা এই Substantive Grade এর সুবিধা পাবে কিন্তু এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা এই সুবিধা পাবে না। এখন প্রশ্ন হলো না পেলে কি হবে? না পেলে যা হবে তা হলো আমরা সকলেই জানি সরকারী বেতন বৃদ্ধির যে বিশেষ সুবিধা প্রাপ্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে সেখানে বলা হয়েছে জাতীয় বেতনস্কেলের তুলনায় গ্রেড-৯ ও তার ঊর্ধ্বে অবস্থানরত শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রতি বছর ১ জুলাই তাদের প্রাপ্য মূল বেতনের ১০ শতাংশ হারে বিশেষ সুবিধা লাভ করবেন। অপরদিকে, গ্রেড-১০ ও তার নিম্ন গ্রেডে থাকা শিক্ষক-কর্মচারীরা একই তারিখ থেকে প্রতি বছর ১ জুলাই প্রাপ্য মূল বেতনের ১৫ শতাংশ হারে ‘বিশেষ সুবিধা’ পাবেন, তবে এই পরিমাণ ১৫০০ টাকার নিচে হবে না। আর বৈষম্যটা এখানেই সরকারী একজন কর্মকর্তা যেখানে এই Substantive Grade এর আওতায় যেখানে বর্তমানে হয়ত গ্রেড ৯ এ অবস্থান করার পরও গ্রেড-১০ এর অবস্থান কারী পেশাজীবির মতো ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা প্রাপ্ত হবে কিন্তু এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেলায় তা হবে না। আমি একটু হিসাব করে দেখাই ধরুন একজন সরকারী চাকুরীজীবি ১০ নং গ্রেডে চাকুরী করেন তাহলে তার বেতন স্কেলে কত ১৬,০০০ তাহলে সে কিন্তু বেতন বৃদ্ধির এই সুবিধায় ১৬০০০*.১৫=২৪০০টাকা পাবে আর এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা পাবে ১৬০০০*.১০=১৬০০টাকা তাহলে এখন বৈষম্যটা বোঝাতে পারলাম নিশ্চয়ই।
এখন প্রশ্ন হলো একজন সরকারি চাকরিজীবীরা যদি Substantive Grade অনুযায়ী অতিরিক্ত ৫ শতাংশ হারে ‘বিশেষ বেতন সুবিধা’ প্রাপ্য হয়। এই সুবিধা কার্যকর হলে তাঁদের মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি চাকরিজীবনের শেষে পেনশন, গ্র্যাচুইটি এবং অবসরকালীন ভাতাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং পেশাগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়।
তাহলে একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক কেন এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে এই প্রশ্নের উত্তর কি আমাদের বিবেকবান আমলারা বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীলতা সাথে দিবেন, যাঁরা একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেন এবং যাঁদের নিয়োগ প্রক্রিয়া, নিয়মনীতির কাঠামো, নিয়ন্ত্রণ ও অনুশাসন সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা (যেমন: মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর – মাউশি) দ্বারা পরিচালিত হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে এই Substantive Grade ভিত্তিক বিশেষ সুবিধা চালু কেন হবে না। ফলে, একজন শিক্ষক যদি টানা ১৫ বা ২০ বছর একই পদে থেকে যান, তবুও তাঁর বেতনে এমন কোনো অতিরিক্ত সুবিধা যুক্ত হয় না যা সরকারি সহকর্মীরা পান।
এই বাস্তবতা থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে:
মূলত এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা যাতে করে এই সুবিধার আওতায় না পড়ে সেই জন্য আজ অর্থমন্ত্রণালয় হতে আজ বুধবার নতুন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। নীতিমালায় স্পষ্টভাবে Substantive Grade-এর ভিত্তিতে বেতন সুবিধা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এই মর্মে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। আর এখানেই শুরু হয় একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য। যেহেতু এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরাসরি সরকারের রাজস্ব খাত থেকে বেতন পান না, কিন্তু তাঁদের নিয়োগের অনুমোদন থেকে শুরু করে বদলি পর্যন্ত সকল কিছু সরকার নির্ধারিত নীতির আলোকে পরিচালিত হয়—তাই তাঁদেরকে আধা-সরকারি বা ‘সরকারি অনুরূপ’ ক্যাটাগরিতে ফেলেও, সুবিধাগুলো কৌশলে না দিয়ে উপেক্ষিত রাখা হচ্ছে।

এমপিওভুক্তদের জন্য বছরের নির্দিষ্ট দিনে ৫% বা ১০% বর্ধিত বেতন দেয়ার উদ্যোগ কোথাও নেই। বরং তারা বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট (৫%) আর বৈষমযুক্ত ৫০% উৎসব ভাতা (যা কেবল এই ঈদুল আযহা থেকে প্রাপ্ত) -নির্ভর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে প্রকৃত মূল্যায়নের তুলনায় খুবই নগণ্য। এমনকি অবসরের পরে তাঁদের পেনশন বা গ্র্যাচুইটি সুবিধাও নেই, ফলে দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে প্রায় অনিরাপদ জীবনযাপন করেন। পেনশন বা গ্রাচুইটি সুবিধার পরিবর্তে যে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের নিজস্ব তহবিলে দায় মেটানো অবসর ও কল্যাণ তহবিলের যে টাকা প্রদান করা হয় তাও আবার দীর্ঘদিন যাবৎ প্রদান বন্ধ রেখেছে। বলা হয়েছে বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের মন্ত্রী আমলারা নাকি এই তহবিলের সকল টাকা চুরি করে নিয়ে গিয়েছে। এই অবসর ও কল্যাণ ফান্ডের কর্তন নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। সরাসরি কোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও আজও ১০% কর্তন বন্ধ করেনি মাউশি।
প্রতিনিয়ত এই নানামুখী বৈষম্যের ফলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীরা কিন্তু তাদের পেশার প্রতি দায়বদ্ধতা হারিয়ে ফেলছে। একটা পেশাজীবি আর কতদিন এভাবে নীপিড়নের শিকার হবে বলতে পারেন। এভাবে বৈষম্যের ফলে যে বিষয় গুলো সামনে আসছে তা হলো-
এই সকল বৈষম্যে থেকে নিরসনের জন্য আমাদের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য এই রাষ্ট্রে যে বিষয় গুলো পদক্ষেপ আকারে নেওয়া জরুরি-
পরিশেষে যে কথাটা বলতে চাই তাহল বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা কেবল সংখ্যাগত নয়, গুণগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাঁদের বঞ্চিত রেখে কোনো শিক্ষানীতিই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। Substantive Grade সুবিধা থেকে তাঁদের বাদ দেওয়া মানে একটি বড় অংশের শ্রমকে অবমূল্যায়ন করা। এটি শুধু মাস শেষে হাতে গোনা কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা নয় এটি একটি ন্যয্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। এই বৈষম্য এখনই দূর করতে না পারলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হবে—এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
vardenafil bcs class genérico do levitra levitra cialis besser