পলাতক সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এবং ঘুষ কেলেঙ্কারিতে ডিবির হাতে গ্রেফতার হওয়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত কর্মচারী নাসির উদ্দিনকে অবশেষে বদলি করা হয়েছে। তিনি এখন ভোলার লালমোহনের সরকারি শাহবাজপুর কলেজে কর্মরত হবেন। বুধবার (২৩ জুলাই) মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এক আদেশে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
একই আদেশে ঢাকা ডিডি অফিস ও একটি সরকারি কলেজে এক দশক ধরে কর্মরত মোছা: ছালমা খাতুনকে বদলি করা হয়েছে লালমনিরহাট সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে। নাসির ও ছালমা—দুজনের বিরুদ্ধেই রয়েছে এমপিও বাণিজ্যসহ অসংখ্য দুর্নীতির অভিযোগ। তাদের বদলির খবর শুনে ঢাকার এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন অনেকেই। একাধিক প্রধান শিক্ষক দৈনিক শিক্ষাডটকমকে জানিয়েছেন, ঘুষ ছাড়া ঢাকা ডিডি অফিসে কোনো কাজ হতো না। নতুন ডিডি মোস্তাফিজুর রহমানও ছিলেন নাসির সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি।
ছালমার বদলি ঠেকাতে যুবদলের নামে এক পাতিনেতা মাউশির একজন ডিডির সঙ্গে যোগাযোগ করলেও মহাপরিচালক ড. মুহাম্মদ আজাদ খান ও পরিচালক কে এম এ এম সোহেল সেটিকে পাত্তা দেননি। তাদের মন্তব্য—বিএনপিপন্থী হলেও ঢাকায় দীর্ঘদিন ঘুষ বাণিজ্য করার সুযোগ পাওয়া সম্ভব হতো না। আর যদি বিএনপিপন্থী হনও, তাহলে দলের পক্ষ থেকে তার দুর্নীতির দায় কেউ নেবে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নাসিরের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বদলি ও শাস্তির সুপারিশ করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক নাসিরের শাস্তি সুপারিশ করলেও সেই ফাইল গায়েব হয়ে যায়। ২০১৮ সালে ডিবি পুলিশের হাতে ঘুষসহ গ্রেফতার হয়েও পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও ঢাকায় ফিরে আসেন নাসির।
দুর্নীতির বড় সিন্ডিকেট হিসেবে পরিচিত এই নাসিরের বিষয়টি পৌঁছায় সাবেক সচিব সিদ্দিক জোবায়ের-এর কাছে। যদিও জোবায়ের দাবি করেছেন, তিনি নাসিরের বদলি আটকে রাখেননি—এ কাজ করেছেন শাহজাহান। অথচ সচিব হিসেবে তার উদাসীনতা এবং অধস্তনদের পাত্তা না দেওয়ার মনোভাব দপ্তরজুড়ে দুর্নীতিকে বেপরোয়া করেছে।
নাসির ও ছালমার বদলির পর ঢাকার ডিডি অফিসে বাকি দুর্নীতিপরায়ণ কর্মচারীরাও পড়েছেন আতঙ্কে। এদের মধ্যে রয়েছেন—
এছাড়া এনসিটিবির দুইজন চৌধুরী পদবিধারী কর্মকর্তা এবং একটি গাইড কোম্পানির পছন্দের সম্পাদকও আতঙ্কে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতিবাজ সাবেক সচিব সিদ্দিক জোবায়ের নিয়মিত বিকেলে এনসিটিবিতে যেতেন এবং বই-কাগজ সিন্ডিকেটের সঙ্গে সরাসরি লেনদেনে জড়িত ছিলেন।
অন্যদিকে এনটিআরসিএতে ১৭ বছর ধরে কর্মরত শাহজাহান খান-এর আত্মীয় পরিচয়দানকারী দীনা পারভীন এবং প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা রয়েছেন বদলি আতঙ্কে।
২০২৪ সালের ২২ মে “ঘুষের রেট বেড়েছে ঢাকা শিক্ষা অফিসে” প্রতিবেদন প্রকাশের পর নাসির-সালমা গং-এর তৎপরতা বেড়ে যায়। ওই রিপোর্টে এমপিওভুক্তির জন্য শিক্ষক ফয়সালের কাছ থেকে ফোনে ঘুষ দাবি করেছিলেন নাসির, পরে সালমাও তাকে ফোন দেন। এমপিও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সিন্ডিকেট গঠন করে মাধ্যমিক শিক্ষার পুরো ব্যবস্থাকে ঘুষ নির্ভর করে তোলা হয়।
অনুসন্ধানে উঠে আসে, একসময় বরখাস্ত হওয়া সালমা আবারও ঘুষ রাজত্ব কায়েম করেছেন ডিডি অফিসে। আর তার পেছনে ছিলো আওয়ামী ঘনিষ্ঠতা, বিশেষ করে শাহেদুল খবির গংদের ল্যাপেন্সার হিসেবে পরিচিত উপপরিচালকের সহায়তা।
ডিবির হাতে একাধিকবার ধরা পড়া নাসিরের পুনঃবহাল প্রক্রিয়া নিয়েও কেউ মুখ খুলতে চান না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ ও আওয়ামী নেতা হানিফের ছায়ায় ছিলেন নাসির।
২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি যুগান্তরে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, লেকহেড গ্রামার স্কুল খুলে দেওয়ার নামে মোতালেব হোসেন ও নাসির উদ্দিন ঘুষ নেন স্কুল মালিকের কাছ থেকে। দুজনকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকাসহ গ্রেফতার করে ডিবি। তখনও তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি, প্রক্রিয়া চলছিল।
মোতালেব হোসেনের রাজধানীতে সাততলা ভবনের খরচও আসে ঘুষের টাকা থেকে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০০৪ সালে মাত্র ২.৭ লাখ টাকায় জমি কেনা সেই বাড়ির বর্তমান মূল্য প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা।
নাসিরের বিরুদ্ধেও ২০১৩ সালে মাউশির এমপিও শাখায় কাজ করার সময় সাতজন শিক্ষককে অবৈধভাবে এমপিওভুক্ত করার অভিযোগে তদন্ত হয় এবং শাস্তির সুপারিশ করা হয়। পরে ঢাকার জেলা শিক্ষা অফিসে বদলি করা হলেও কিছুদিনের মধ্যেই আবার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ফেরেন।
বনভোজন কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে নাসির রাজধানীর প্রায় সব প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা তুলেছেন। অভিযোগ রয়েছে, বনভোজনের আগে তিনি নিখোঁজ হওয়ার নাটক সাজিয়ে প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন।
সবশেষে, এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তি দেখা যায়নি। বরং এই সিন্ডিকেটের আশ্রয়ে বহু দুর্নীতিবাজ এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে।
(সংগৃহিত)
Leave a Reply