রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল-কলেজ ভবনের ওপর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয়েছে। এতে অন্তত ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী দগ্ধ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, আরও অনেকে ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকতে পারেন। ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ উদ্ধার অভিযান চলছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, বিমানটি পশ্চিম দিক থেকে এসে কলেজের দক্ষিণ পাশে একটি মাঠের ওপর বিধ্বস্ত হয়। মাঠজুড়ে নারকেল গাছের সারি থাকলেও বিমানটি সেগুলো ভেদ করে ভবনের দোতলায় আছড়ে পড়ে এবং সরাসরি একটি শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পড়ে। সে সময় ক্লাস চলছিল, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা কক্ষে অবস্থান করছিলেন। প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, বিমানটি ক্লাস থ্রি ও ফোরের শ্রেণিকক্ষে সরাসরি আঘাত হানে এবং দোতলার সেভেন ও এইট শ্রেণির কক্ষগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই বিকট বিস্ফোরণ ঘটে এবং অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তেই আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। বিমানের আঘাতে শ্রেণিকক্ষগুলোর দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ভেতরে আটকে পড়েন এবং বের হতে পারেননি। আগুনের তীব্রতা ও ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকর্মীদের পক্ষে শুরুতে শ্রেণিকক্ষগুলোতে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না। অনেক শিক্ষার্থী অগ্নিদগ্ধ হন এবং বেশ কয়েকজন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দা ও কলেজের শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেন। এরপর ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে বড় পরিসরে উদ্ধার কাজ শুরু করে। আহতদের প্রাথমিকভাবে অ্যাম্বুলেন্স ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ভবনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। বিমানের ধ্বংসাবশেষ সরাতে একটি বড় ক্রেন আনা হয়েছে। এখনও উদ্ধারকাজ চলমান এবং ভিতরে কেউ আটকে আছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উদ্ধারকারীরা বিমানের ধ্বংসাবশেষ ও অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করছেন।
উদ্ধারকারীরা বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন, সাধারণ মানুষ যেন ঘটনাস্থলে ভিড় না করে বরং হাসপাতালে রক্তদান করে আহতদের সহায়তা করেন। বিভিন্ন রক্তের গ্রুপের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সাংবাদিকদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখা হলেও পরে কিছু মিডিয়া কর্মী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন এবং দুর্ঘটনার ভয়াবহতা ধারণ করেন।
দুর্ঘটনার পরে শিক্ষার্থীদের পোড়া স্কুলব্যাগ, বই, ড্রেস, টিফিন বক্স ও জুতা উদ্ধার করা হয়, যা ঘটনাটির নির্মমতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এখনো পর্যন্ত নিহত ও আহতের সঠিক সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি। যেসব অভিভাবক এখনো তাদের সন্তানদের সন্ধান পাননি, তাদের হাসপাতাল ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অষ্টম শ্রেণীপড়ুয়া এই শিক্ষার্থী জানান, দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন হাসপাতালে আহতদের পাঠানো হয়, কিন্তু জাতীয় বার্ন ইউনিট, ঢামেক ও কুর্মিটোলার মত হাসপাতালগুলো জায়গা সংকুলান করতে পারছিল না। অনেককে ফিরিয়ে দিতে হয়েছে।
প্রেরণার ভাষ্যমতে, ওইখানে সেনাবাহিনীরা ছিল। তারা সবাই দৌড়ে এসেছে, সবাইকে বের করেছে। অনেকে অল্প আঘাত পেয়েছে। অনেকেই বেশি রকমের ইনজুরড। আমাদের ওইখান থেকে সরিয়ে দিচ্ছে, দেখতে দেবে না কিছুই। এরপর আমাদের ঢামেক, বাংলাদেশ মেডিকেল এবং কুর্মিটোলা- এই তিনটার কথাই বলা হয়েছে। কিন্তু ওই তিনটাই নাকি জায়গা নিচ্ছে না। মানুষে ভরে গেছে, এই টাইপের একটা কথা বলে সবাইকে বের করে দিচ্ছে। এরপর এই হাসপাতালে আনা হয়েছে।
প্রেরণার ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনে যারা ছিল তাদের অধিকাংশই ছিল ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থী।
বিস্ফোরণের সময় প্রসঙ্গে এই শিক্ষার্থী বলেন, একটা ৬ মিনিটের দিকে প্লেনটা পড়েছে। আমাদের বের করবে ১টা ১০ মিনিটে বলছে। তবে নিচে থাকা বাংলা ভার্সনের অনেকেই বের হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ইংরেজি ভার্সনের অনেকে ছিল। ৭০ থেকে ৮০ জনের মত সবমিলিয়ে।
ভবনটির পূর্বাবস্থা ব্যাখ্যা করে প্রেরণা যোগ করেন, এটা আগে হোস্টেল ছিল। তাই জানালা কাঁটা। ফলে, জানালা খুলে অনেকে বের হয়ে যেতে পারছে। অনেকে পারে নাই। মেয়েদের অনেকে বের হয়ে যেতে পারছে। ফায়ার ফাইটাররা অনেককে বের করতে পারছে। বিশেষ করে, সেনাবাহিনীরা। ছাত্রদের তাড়াতাড়ি বের করছে সেনাবাহিনী। নিচ থেকে ভবনের গেট ধাক্কা দিয়ে ভেঙে দিয়েছে। যেন বের হয়ে যেতে পারে, তারপরে ওইখান থেকে বের হয়ে গেছে।
সে সময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করে এই শিক্ষার্থী বলেন, আমি দেখেছি, অধিকাংশের হাত-পা একদম পুরে গেছে। চামড়া পুরে গেছে, স্কুল-ড্রেস ছিঁড়ে গেছে। শরীর রক্তাক্ত। চেহেরা একদম পুরে গেছে; বুঝা যাচ্ছিল না কারা যাচ্ছে, কোন শিক্ষার্থী। ওইখান থেকে অনেকেই মারা গেছে নিশ্চিত। কারণ, চেয়ারে যেভাবে বসে ছিল, আমরা দেখেছি, ওইভাবেই পরে আচ্ছে এবং হাত-পা একদম কালো। ফ্রিজ ওরা, ওইটা দেখে বুঝা গেছে, ওরা আর নেই।
তিনি আরও বলেন, অনেকে বলেছে, মরে নাই মরে নাই। কিন্তু আমরা নিজে দেখছি, মানুষ সাহায্যের জন্য যাচ্ছে। এরপরও ওরা একদম শক্ত হয়ে আছে। ফ্রিজ হয়ে গেছে। ফলে, অনেকের ধারণা মারা গেছে তারা। প্লেনটা ভবনে পড়ছে, মাঠে পড়ে নাই। মাঠে পড়ার বিষয়টি ফেইক। ওপর থেকে পড়েছে।
(তথ্য সংগ্রহ ইউটিউব ও টিভি খবর হতে)
Leave a Reply