বাংলাদেশের শিক্ষাখাত, বিশেষ করে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার ও সুফল নিশ্চিত করতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অদক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়া এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির কার্যকরতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। বিশেষত ফ্যাসিস্ট ধাঁচের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা কিছু আমলাদের দোর্দণ্ড প্রতাপ, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এক অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি করেছে, যা শিক্ষক-কর্মচারীদের ন্যায্য দাবিগুলোর বাস্তবায়ন ঠেকিয়ে রাখছে। যেকোন ভাল ও শিক্ষকদের উন্নয়ন মুলক কাজে তাদের অন্যায্য হস্তক্ষেপ শুধু শিক্ষক কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা নয় তাদের মনোবল নষ্ট করে দিচ্ছে দিনের পর দিন।
মাউশিতে যেভাবে আমলাতন্ত্র প্রভাব বিস্তার করেছে, তাতে মনে হয় এটি যেন আর শিক্ষাপ্রশাসনের একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং আমলাদের কর্তৃত্ব ও গুটিকয়েক ক্ষমতাবান চক্রের হিংস্র রক্ষণাবেক্ষণের এক দুর্গ। তারা যে কেবল নিয়মিত এমপিওভুক্ত বেতন প্রক্রিয়াকেই জটিল করে তোলে তা নয়, বরং বিদেশি দাতা সংস্থার দেওয়া অনুদান বা সুবিধাও যাতে মাঠপর্যায়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে পৌঁছাতে না পারে—সে দিকেও সচেতনভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যাচ্ছে নিয়মিত ভাবে। প্রশ্ন উঠেছে, কেন এই বারবার প্রতিবন্ধকতা? এর পেছনে রয়েছে একটি অদৃশ্য প্রতিযোগিতা, একটি হিংসাত্মক মানসিকতা—যেখানে ফ্যাসিবাদী মনোভাবসম্পন্ন আমলারা কখনোই চান না সাধারণ শিক্ষক সমাজ সফল হোক বা সরকারি সুবিধা যথাযথভাবে প্রাপ্তি ঘটুক। এখন এখানে যে প্রশ্নটি ঘুরেফিরে আর সাধারণ দশটা মানুষের মতো আমার আপনার সকলের মনের মধ্যেই উকি দেয় তা হলো এই বিষয়গুলো কি আমাদের রাষ্ট্রের পরিচালনার দায়িত্ব যাদের নিকট তারা কি টের পাননা নাকি টের পেয়েও তা না দেখার ভান করে থাকেন। আসলে সত্যি কথা বলতে কি এ ক্ষমতাবান ফ্যাসিস্টের দোসদের স্তর এত বেশি যে সেই স্তর ভেদ করে সঠিক জায়গায় সঠিক খবর পৌছানো অনেকটা দুরুহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
এটি কেবল দাফতরিক ব্যর্থতা নয়, এটি একটি মানসিক ও আদর্শিক সংকট। যেসব আমলা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির দোসর ছিলেন বা এখনও সেই মানসিকতা বহন করছেন, তারা শিক্ষাব্যবস্থাকে নয়, বরং নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তিকে টিকিয়ে রাখতেই বেশি সচেষ্ট। তাদের কাছে শিক্ষকরা কেবল ফাইলে থাকা সংখ্যামাত্র, মানবিক সম্মান বা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিদার কোনো শ্রেণি নয়। ফলে, প্রতিবারই দেখা যায়, বেতন-ভাতা, ইএফটি সুবিধা কিংবা পদোন্নতির মতো মৌলিক অধিকার পেতে শিক্ষক সমাজকে আন্দোলন, অনুনয়-বিনয় কিংবা রাজনৈতিক চ্যানেল অবলম্বন করতে হয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো—মাউশিতে কাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কার। এর আওতায় অযোগ্য, দুর্নীতিপরায়ণ ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত আমলাদের অপসারণ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগব্যবস্থা চালু, এবং শিক্ষক প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের সম্মান ও সুযোগ নিশ্চিত না করে কোনো দেশই একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনের স্বপ্ন দেখতে পারে না।
তাই এখন সময় এসেছে মাউশিকে আমলাতন্ত্রের গ্যাঁড়াকল থেকে মুক্ত করে প্রকৃত অর্থে শিক্ষাবান্ধব ও ন্যায্যতাভিত্তিক এক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার। শিক্ষক-কর্মচারীদের সম্মান রক্ষা, তাদের অধিকার বাস্তবায়ন, এবং শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মানোন্নয়নের লক্ষ্যে এই সংস্কার আর বিলম্ব নয়—অবশ্যই জরুরি।
Leave a Reply