বাংলাদেশে সংস্কার ইস্যুতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গত কয়েক মাস ধরে একাধিক দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করলেও মৌলিক অনেক বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব হয়নি। এমনকি যে সকল বিষয়ের ওপর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন হবে গণভোটের মাধ্যমে নাকি সংসদ নির্বাচন দিয়ে—এই বিতর্কও বর্তমানে সামনে চলে এসেছে।
কমিশনের প্রত্যাশা, দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে খুব শিগগিরই ‘জুলাই সনদ’ ঘোষণা করা যাবে। তবে ‘জুলাই সনদ’ আসলে কী, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে মতানৈক্যের কারণ কী এবং ‘জুলাই সনদ’ ও ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’-এর মধ্যে পার্থক্য কী—এসব প্রশ্ন এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কয়েক ধাপের আলোচনায় ইতিমধ্যে একাধিক সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে। তবে এখনো আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কার বিষয়ে ভিন্নমত অব্যাহত রয়েছে।
কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, মতপার্থক্য সত্ত্বেও চলতি মাসের শেষের দিকে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতির ভিত্তিতে ‘জুলাই সনদ’ চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে কিছু বিষয়ে এখনো ঐকমত্য না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে সনদ প্রস্তুত হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, যদি সময়মতো ‘জুলাই সনদ’ প্রকাশ সম্ভব না হয়, তাহলে আগামী ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছে এনসিপি।
এ নিয়ে কমিশন বলছে, ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ এবং ‘জুলাই সনদ’ এক জিনিস নয়। সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে সংস্কার প্রস্তাবনাগুলো চূড়ান্ত হবে, সেটিই হবে ‘জুলাই সনদ’ বা জাতীয় সনদ। অন্যদিকে, ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ তৈরি কমিশনের দায়িত্ব নয়—এটি সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর যৌথ উদ্যোগে হবে। কমিশনের কাজ কেবল ‘জুলাই সনদ’ প্রস্তুত করা।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে গত ৩১ ডিসেম্বর ‘জুলাই প্রোক্লেমেশন’ নামে একটি ঘোষণা প্রকাশের কথা ছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা সেই অবস্থান থেকে সরে আসে। সরকার তখন ‘জুলাই সনদ’ ও ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
‘জুলাই সনদ’ কী?
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস ৬ জুন জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে বলেন, “জুলাই সনদ হচ্ছে একটি প্রতিশ্রুতি। জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণে সংস্কার কমিশনের দেওয়া প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো যেসব প্রস্তাবে একমত হয়েছে, তার তালিকা থাকবে এই সনদে।”
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে যে ১১টি কমিশন গঠন করা হয়, সেই সব কমিশনের সুপারিশ নিয়েই রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে ঐকমত্য কমিশন। কমিশনের তথ্য মতে, সংবিধান, নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ মোট ১৬৬টি সুপারিশ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই আলোচনায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি সহ মোট ৩০টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে। কমিশনের তথ্যমতে, এর মধ্যে ৮০টির বেশি প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলো সর্বসম্মত হয়েছে। এছাড়া আরও প্রায় ২০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে।
কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, এই ২০টির মধ্যে এখন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। বাকি ছয়-সাতটি প্রস্তাব নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
কমিশনের মতে, বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজি করিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলে তবেই পূর্ণাঙ্গ ‘জুলাই সনদ’ তৈরি করা যাবে।
কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “আমাদের এখন কিছু মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য প্রয়োজন। তা না হলে আবার স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিতে পারে।”
যদিও কমিশন এখনো সংস্কার প্রস্তাবগুলোকে ‘জুলাই সনদ’ নামে উল্লেখ করছে, তবে শেষপর্যন্ত এটির নাম পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে। অধ্যাপক রীয়াজ বলেন, “আসলে এটি একটি জাতীয় সনদ। তবে জুলাই সনদ বললে বুঝা যাবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কী ঘটেছিল এবং সেই প্রেক্ষাপটেই এই সনদ তৈরি হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “জাতীয় বা জুলাই যাই বলা হোক, এই সনদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সনদ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “জুলাই আমাদের একটি বার্তা দিয়েছে। এই বার্তাকে দলিলবদ্ধ করা জরুরি, এজন্যই জুলাই সনদ প্রয়োজন।”
রাজনৈতিক ঐকমত্য নিয়ে প্রশ্ন
দ্বিতীয় দফার আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেসব প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে: সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সম্পর্কিত বিধান সংশোধন এবং হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, এখনও ছয়-সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা চলছে, যেগুলোতে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবুও, ঐকমত্য অর্জনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এই পর্বে আলোচনার মূল ইস্যুগুলোর মধ্যে ছিল প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস, দলীয় প্রধান ও সরকারপ্রধানের দায়িত্বে পৃথক ব্যক্তির নিয়োগ এবং এনসিসি গঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপদ্ধতি সংস্কার। তবে এসব বিষয়ে সব দলের মত এক নয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ প্রশ্ন তুলেছেন, “যদি সব বিষয়ে ঐকমত্য কমিশনের সাথে একমত হতে হয়, তাহলে আলোচনার প্রয়োজন কী?”
অধ্যাপক রীয়াজ এ প্রসঙ্গে বলেন, “এর মানে এই নয় যে, আমরা কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি বা বিষয়গুলো বাতিল হয়ে গেছে। আলোচনা অব্যাহত আছে এবং আমরা আশাবাদী।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “সব ইস্যুতে একমত হওয়া সম্ভব নয়। সবাই চায় নিজেদের মতামত ও অবস্থান এই সনদে প্রতিফলিত হোক। এভাবে চললে ঐকমত্য তৈরি কঠিন।”
‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের পথ কী?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন হলো, চূড়ান্ত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের পদ্ধতি কী হবে? কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর এ নিয়ে অবস্থান একরকম নয়।
প্রস্তাবগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে উপস্থাপন করার সময় ছয়টি সম্ভাব্য বাস্তবায়ন পদ্ধতির কথা বলা হয়েছিল: নির্বাচনের আগে অধ্যাদেশ, নির্বাচনের আগে গণভোট, নির্বাচনের সময় গণভোট, গণপরিষদ, নির্বাচনের পর সাংবিধানিক সংস্কার এবং নির্বাচিত সংসদের দ্বৈত ভূমিকা (গণপরিষদ ও আইনসভা)।
বিএনপি, সিপিবি ও বাসদসহ বিভিন্ন দল মনে করে, জাতীয় সংসদের মাধ্যমেই সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব। অন্যদিকে, এনসিপি চায় গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে এই সংস্কার বাস্তবায়ন হোক।
জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনসহ আরও কয়েকটি দল এখনো রাজনৈতিক ঐকমত্যের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের মতে, যদি সব দলের স্বাক্ষরে একটি সনদ চূড়ান্ত হয়, তাহলে আগামী নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে তার বাস্তবায়ন সম্ভব।
এই দ্বিধাবিভক্ত অবস্থান ‘জুলাই সনদ’-এর বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে কি-না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
তবে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক রীয়াজ বলেন, “আমরা কোন বিষয় পরিবর্তন করা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করতে পারি, কিন্তু কীভাবে তা বাস্তবায়ন হবে, সেই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তী সরকারকেই নিতে হবে।”
তিনি যোগ করেন, “আমরা ‘হোয়াট’ নিয়ে কাজ করছি, ‘হাউ’ নিয়ে নয়। যদি ঐকমত্যে পৌঁছে একটি সনদ তৈরি করা যায়, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো মিলেই তার বাস্তবায়নের পথ নির্ধারণ করতে পারবে।”
Leave a Reply