শিক্ষকদের ট্রেনিং নিয়ে আমলাদের এতে মাথা ব্যাথার কারণ কি?
শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের বিকল্প নাই এটা সত্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে শিক্ষকদের ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণগুলোর আসল যে উদ্দেশ্য তা কতটুকু বাস্তবায়ন হয় তা নিয়ে ঘটা করে কিছু না বললেও কারও আশা করি বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। শিক্ষক প্রশিক্ষণের মুল উদ্দেশ্য হল শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন হলেও আমাদের দেশে শিক্ষক প্রশিক্ষণের আলাদা একটি উদ্দেশ্য পরিললক্ষিত হয় বা দৃশ্যমান হয় সকলের নিকট তা হলো প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা কে কিভাবে কত সুন্দরভাবে হাপিতেশ করতে পারে তা বাস্তব নমুনা দেখতে হলে টেনিং স্পটে যেতে হবে তাহলেই দেখা যাবে। প্রশিক্ষণ নিয়ে একটি অদৃশ্য প্রশাসনিক জটিলতা দীর্ঘদিন ধরেই বিরাজমান। প্রশ্ন ওঠে, কেন এই শিক্ষাবিষয়ক মৌলিক প্রয়োজনটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট আমলাদের মধ্যে এত দেখা যায়? সেটি যদি খুঁজতে যাওয়া যায় তাহলে এর প্রকৃত কারণ কিন্তু বের করা খুব বেশি কষ্টসাধ্য বিষয় না।
প্রথমত, আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোতে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মাঝে যে ব্যবধান রয়েছে, তার বড় শিকার হচ্ছে শিক্ষকদের ট্রেনিং। নীতিনির্ধারক আমলারা অনেক সময় শিক্ষাক্ষেত্রের প্রকৃত চাহিদা অনুধাবন না করেই ফাইলচালিত প্রস্তাব তৈরি করেন। এতে বাস্তবমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের পরিবর্তে বছরে এক-দুই দিনের আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করা হয়, যা আদৌ কোনো সুফল বয়ে আনে না। এবং আরও কিছু বিষয় এখানে তুলে ধরা যায় তা হলো ট্রেনিং বাস্তবায়নের দায়িত্বে যারা থাকে অর্থাৎ যে আমলারা বা সরকারের যে ট্রেনিং বাস্তবায়নের যে সকল কর্মকর্তা কর্মচারী নিযুক্ত থাকে তাদের কল্যানেই ট্রেনিং তিন ভাগের দুই ভাগ টাকা ব্যয় হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, আমলাদের অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো শিক্ষককে ‘পরিচালনার অধীন কর্মী’ হিসেবে দেখে, ‘সহযোগী পেশাজীবী’ হিসেবে নয়। এই মনোভাব থেকে তারা শিক্ষকদের জন্য যে নামকাস্তে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেন সেখানে থাকেনা কোন মান সম্মত প্রশিক্ষক, থাকেনা মান সম্মত পরিবেশ। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় সেখানে প্রশিক্ষণের থেকে বাড়তি নজর থাকে কিভাবে প্রশিক্ষণের সময় শেষ করা যায়। কিভাবে প্রশিক্ষণের প্রকল্পের টাকা সুন্দরভাবে হস্তগত করা যায়। প্রশিক্ষণের সময় শিক্ষকদের জন্য যে বরাদ্দগুলো থাকে তা বিভিন্ন ভাবে কাটছাট করতে করতে নূর্ণতম অবস্থায় নিয়ে আসা হয় তারপরও যে সম্মানীটুকু থাকে তা সময়মতো শিক্ষকদের প্রদান করা হয় না। সেই টাকা অযথা অযৈাক্তিক ভাবে দেরি করে প্রদান করা হয়। শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ চলাকালীন যে নাস্তা ও দুপুরের খাবার বাবদ বরাদ্দ থাকে সেই বরাদ্দও উপজেলা বা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের লোলুপদৃষ্টি থেকে রেহাই পায় না। ট্রেনিংকে তারা একটি বাড়তি ঝামেলা হিসেবে বিবেচনা করেন ঠিকই কিন্তু ট্রেনিংয়ের বরাদ্দকে তারা আশির্বাদ হিসাবে বিবেচনা করেন ঠিকই। প্রকৃতপক্ষে, শিক্ষক যখন দক্ষ হন, তখন শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষার্থীর মানোন্নয়ন ঘটে—এমন দূরদৃষ্টি অনেক সময় প্রশাসনিক মনোভাবে অনুপস্থিত থাকে। যদি সেটাই না হবে তাহলে উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসারগণ কেন মানহীন প্রশিক্ষক নিয়োগ দিবেন উৎকোচ গ্রহণের মাধ্যমে।
তৃতীয়ত, ট্রেনিংয়ের বাজেট, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় একাধিক স্তরে জটিলতা তৈরি হয়। আমলারা ট্রেনিংকে কেন্দ্র করে প্রকল্প গ্রহণ করলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে শিক্ষক-নির্ভরতা কম এবং আমলা-নির্ভরতা বেশি থাকে। এতে করে মাঠপর্যায়ে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ খণ্ডিত ও অনুৎসাহী হয়ে ওঠে। আর আমলাদের আগ্রহ বাড়ে অর্থের ঝনঝনানির জন্য।
তাছাড়া, যেসব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তার অনেকগুলোতেই যুগোপোযোগী কনটেন্টের অভাব থাকে। প্রশাসনের একটি অংশ মনে করে, ট্রেনিং মানে শুধু কিছু ফরম্যাট শেখানো বা নীতিমালা পাঠ করানো। অথচ শিক্ষক চাইছেন আধুনিক পেডাগজি, ডিজিটাল শিক্ষা, শিক্ষার্থীবান্ধব কৌশল সম্পর্কে বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ। কিন্তু সেসব দিক অগ্রাধিকার না পাওয়ায় ট্রেনিং কার্যক্রম কেবল প্রথাগত রুটিনে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। সকাল ৯ থেকে ৫টা পর্যন্ত শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে উপস্থিত থাকে ঠিকই কিন্তু তাদের মনোযোগ কিন্তু সেখানে থাকেনা। সবচেয়ে দৃষ্টিকুটু যে বিষয়টি পরিলক্ষিত হয় তা হলো মানসম্পন্ন প্রশিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি। একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে কিন্তু প্রশিক্ষকের দুরদর্শিতার উপর কিন্তু সেই প্রশিক্ষকের উপর যদি প্রশিক্ষণার্থীদের আস্থা না থাকে তাহলে কিন্তু কোনভাবেই প্রশিক্ষণের মুলভাব অর্জিত হবে না।
পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষকদের ট্রেনিং নিয়ে আমলাদের মাথাব্যথার মূল কারণ হলো, শিক্ষার প্রতি ভালবাসা থেকে নয়, দেশ ও জাতিকে উন্নতির চরম শিখড়ে পৌছানোর উদ্দেশ্যে নয়। তাদের উদ্দেশ্য হলো ব্যাক্তিগতভাবে লাভবান হওয়া। আর এই কারণে শিক্ষার উন্নয়ন করতে হলে শিক্ষকদের ব্যাক্তিগত উন্নয়নের দিকে তাদের দৃষ্টি নাই। শিক্ষকদের মৌলিক চাহিদা অপূর্ণ রেখে তাদের নজর শুধু ট্রেনিং কার্যক্রম কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায় সেই দিকে। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি বাস্তব ও দৃষ্টিভঙ্গিগত উদাসীনতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে দিন দিন অতল গহ্বরে তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই নজর কিন্তু এদেশের কোন নীতিনির্ধারণী আমালাদের নাই। একটি গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ শিক্ষাব্যবস্থা গড়তে হলে ট্রেনিংকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং শিক্ষার মানোন্নয়নের কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষকদের জীবন মান উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে, শিক্ষকদের অভুক্ত রেখে আপনি কখনও ভাল কিছু আশা করতে পারেন না। কারণ দিন শেষে শিক্ষাকে গ্রাসরুট লেভেলে বাস্তবায়নের দায়িত্ব কিন্তু আমাদের দুর্দশা পীড়িত শিক্ষকদের সেখানে কিন্তু কোন আমলারা দামী গাড়িতে চড়ে এসে বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেয় না। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য যে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় সেখানে শুধু আমলাদের কথামত বাস্তবায়নের নানা দিক নিয়ে না ভেবে মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করবে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেয় অধিকতর ন্যায়সঙ্গত বিষয়।
Leave a Reply