এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দাবি এবং তাদের আন্দোলন এখন পর্যন্ত যথেষ্ট জটিল এবং একদিকে যেমন সরকারি নীতির অভাব এবং প্রশাসনিক অবহেলার শিকার, তেমনি আমলাতন্ত্রের নানা অঙ্গভঙ্গি এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষকদের অধিকারের দিকে সরকারের এবং প্রশাসনের অজ্ঞতা কিংবা অবহেলা প্রমাণিত হয়েছে, এবং তার ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের সমাধান দীর্ঘদিনের জন্য মুলতবি হয়ে থাকে।
আমি এখানে চেষ্টা করেছি বাস্তবিক কিছু আলোচনা তুলে ধরার, কেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আন্দোলন তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে পারছে না এবং এর পেছনে আমলাতন্ত্রের অবদান কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আরও পড়ুন…..ইএফটির সকল সমস্যা দূর হবে কোনদিন?
১. আমলাতন্ত্রের গড়িমসি এবং প্রশাসনিক জটিলতাঃ
আমলাতন্ত্র শিক্ষকদের দাবি এবং সমস্যাগুলির সমাধান বাস্তবায়নে গড়িমসি এবং প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি এবং অন্য অধিকার আদায়ের জন্য সরকার বা মাউশির থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, কিন্তু অধিকাংশ সময় প্রশাসনিক তৎপরতা ধীর হয়ে থাকে। এর ফলে শিক্ষকদের দাবি প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে আগ্রহের অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর এক্ষেত্রে আমাদের আমলাতন্ত্র সকল সময় এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের চাওয়া পাওয়ার ক্ষেত্রে সুনিশ্চিতভাবে বিরোধিতা করে থাকে।
প্রশাসনিক স্তরে কাজের গতির অভাব এবং সিদ্ধান্তের নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকলে আন্দোলনের ফলাফল অনেক সময় অর্জন করা কঠিন হয়ে যায়। সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে যেসব ইনসেন্সটিভ (উৎসাহ) থাকে, তা তাদের কাজকে প্রভাবিত করে, এবং অদৃশ্যভাবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধার বিষয়েও এই সংস্কৃতি চলে আসে।
২. শিক্ষকদের প্রতি অসম্মান ও অবহেলাঃ
মৌলিক সমস্যাগুলির মধ্যে একটি প্রধান কারণ হলো শিক্ষকদের প্রতি অসম্মান। শিক্ষকরা তাদের অধিকার আদায়ে যখন আন্দোলন শুরু করেন, তখন তাদের প্রতি প্রশাসনেরর অনেক সময় অবহেলা এবং অমান্যতা দেখা যায়। মূলত, শিক্ষকদের পেশাদারিত্বের প্রতি সম্মান এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকার গুরুত্ব অনেক সময় উড়িয়ে দেয়া হয়। এতে করে, শিক্ষকরা নিজেরাই আস্থা হারাতে শুরু করেন, এবং তাদের আন্দোলন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আমাদের আমলাতন্ত্র কখনও এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের ত্যাগের মুল্যায়ন কোন এক অজানা কারণে করতে চায়না।
৩. শিক্ষকদের সংগঠিত আন্দোলনের অভাবঃ
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আন্দোলন আজও সঠিকভাবে সংগঠিত হতে পারেনি এটা অনেকটা সত্যি। অনেক সময় আন্দোলনের নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়েছে সঠিক নেতৃত্বের অভাবে, এবং পৃথক পৃথক দাবির ভিত্তিতে আন্দোলনগুলো বিভক্ত হয়ে যায়। এই বিচ্ছিন্নতা আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে পারছে না এবং সমাধান ত্বরান্বিত হচ্ছে না। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং নেতৃত্বের অভাব একে কার্যকরী করতে পারছে না। আর সুযোগটাই খুব চাতুরতার সাথে ব্যবহার করছে আমাদের আমলাতন্ত্র।
৪. শিক্ষাব্যবস্থায় নীতিগত দুর্বলতাঃ
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দাবির মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থার গঠনমূলক পরিবর্তন রয়েছে, যা পূরণ করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী কার্যকর পদক্ষেপের দাবি করে। কিন্তু আমলাতন্ত্র সবসময় কিছু একটা অজুহাত তুলে নীতির বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেয়। সরকারের শিক্ষা খাতে নিয়োগ, বেতন, পেনশন ইত্যাদি বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা বা কার্যকরী পরিকল্পনা অনেক সময় দেখা যায় না, ফলে শিক্ষকদের সমস্যা দীর্ঘদিনের জন্য ঝুলে থাকে।
৫. অর্থনৈতিক সংকটের অজুহাতঃ
সরকারের পক্ষ থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রদান করতে অর্থনৈতিক সংকট ও সরকারি বাজেটের সীমাবদ্ধতা অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যদিও সরকারী খাতে আর্থিক সংকট রয়েছে, তবে সেই সংকট কখনোই শিক্ষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে অন্তরায় হওয়া উচিত নয়। অর্থনৈতিক সংকট এবং আর্থিক খরচের অজুহাত শিক্ষকদের আন্দোলন বা দাবির বাস্তবায়নকে কিছুটা দেরিতে ফেলতে পারে, কিন্তু তা একমাত্র কারণ নয়। সঠিক পরিকল্পনা যদি গ্রহণ করা যায় তাহলে এ সমস্য দুর করা কোন কঠিন কাজ নয়। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রধান বাঁধা আমাদের আমলারা। তাদের সুযোগ সুবিধা গ্রহণে কোন সংকট অজুহাত হিসাবে দাাঁড়ায় না কিন্তু এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের সময় নানা অজুহাত তারা দেখায়।
৬. শিক্ষকদের বিষয়ে সরকারী সুনির্দিষ্ট নীতির অভাবঃ
মৌলিক সমস্যাগুলির মধ্যে একটি হলো শিক্ষা খাতে বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষা খাতে সরকারী দিকনির্দেশনা এবং নীতির অভাব রয়েছে যা দিন দিন আরও প্রকট আকাড়ে দেখা যাচ্ছে। শিক্ষকদের জন্য যে সুনির্দিষ্ট এবং স্থায়ী নীতি থাকতে হবে, তা প্রায়শই অস্পষ্ট বা অসম্পূর্ণ থাকে। ফলস্বরূপ, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অধিকার অর্জনের পথে সমস্যার সৃষ্টি হয়। সরকারের নীতিগত অস্পষ্টতা শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনকে আরও জটিল করে তোলে। এই সমস্যাগুলো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষোভের সৃষ্টি করছে।
৭. আমলাতন্ত্রের বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টিঃ
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দাবিগুলির মধ্যে প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া এবং অনেক সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্র শিক্ষক আন্দোলনগুলোকে বিরোধিতা করার জন্য বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, যেমন শিক্ষক নেতৃবৃন্দের উপর চাপ সৃষ্টি করা, সংগঠনগুলোকে বিভক্ত করা ইত্যাদি। এতে আন্দোলনের একতাবদ্ধতা ভেঙে যায় এবং শিক্ষকরা পুনরায় হতাশ হয়ে পড়ে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আন্দোলন এবং তাদের চাওয়া-পাওয়া প্রতিনিয়ত আমলাতন্ত্রের শিকার হচ্ছে। অবহেলা, প্রশাসনিক গড়িমসি, নেতৃত্বের অভাব এবং নীতিগত দুর্বলতা আজও শিক্ষা খাতে সংস্কারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঠিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক তৎপরতা, সংগঠিত আন্দোলন এবং সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষকদের অধিকার নিশ্চিত করা যায়। যদি এই সমস্যাগুলোর সমাধান না হয়, তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অধিকার আদায়ে শিক্ষকদের সংগঠিত আন্দোলন আরও কঠিন হতে পারে, তবে অবশ্যই তারা যদি একত্রিত হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যায়, তাদের দাবি শীঘ্রই পূর্ণতা পাবে।
Leave a Reply