অর্থনৈতিক চাপ, রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সতর্ক অবস্থানের কারণে বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। প্রশাসনিক, আর্থিক ও আইনি প্রস্তুতির বিভিন্ন বিষয় এখনো পর্যালোচনার পর্যায়ে থাকায় নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণায় কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, একবারে সম্পূর্ণ বেতন-ভাতা বৃদ্ধি না করে ধাপে ধাপে নবম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর করার একটি প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন বা বেসিক বৃদ্ধি করা হতে পারে। পরে দ্বিতীয় ধাপে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, উৎসব ভাতা, শ্রান্তি বিনোদনসহ অন্যান্য ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। যদিও এই পরিকল্পনা এখনো নীতিগত আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
বর্তমান বিধান অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা পুনর্বিবেচনার কথা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে গত এক দশকে দেশে নতুন কোনো জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। অর্থনীতি ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে নতুন পে স্কেল সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। তবে একই সঙ্গে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং রাজস্ব পরিস্থিতির বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। নবম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হলে এই বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন। এর ফলে সরকারের বার্ষিক ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়সহ মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে হলে অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমান রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতিতে এই বিপুল অর্থের সংস্থান সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব আহরণ করতে না পারায় সরকারের রাজস্ব ঘাটতি আরও প্রকট হয়েছে। এর ফলে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলে ঘাটতি বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ বরাদ্দেও প্রভাব পড়তে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারকে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। সংস্থাটির আশঙ্কা, একসঙ্গে বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি করা হলে বাজারে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ তৈরি হবে, যা মূল্যস্ফীতিকে আবারও উসকে দিতে পারে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি না হলে সরকারকে দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের আইনি, প্রশাসনিক ও আর্থিক দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা চলছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন বৈঠকে সম্ভাব্য ব্যয়, অর্থের উৎস, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের রূপরেখা এবং বাস্তবায়নের সময়সূচি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠক করেছে। কমিটি নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ, অষ্টম জাতীয় পে স্কেলের সীমাবদ্ধতা, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, মূল্যস্ফীতির প্রভাব এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করছে। পাশাপাশি নতুন পে স্কেলের মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বৈষম্য কমানো, যৌক্তিক বেতন কাঠামো নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, কমিটির আরও দুই থেকে তিনটি কারিগরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত চূড়ান্তভাবে পর্যালোচনা করা হবে। এরপর একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রতিবেদন প্রস্তুত করে তা মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী আগস্ট মাসের প্রথম অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহে নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে। তবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বা আর্থিক সিদ্ধান্তে বিলম্ব হলে গেজেট প্রকাশের সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তনও আসতে পারে।
তবে গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নতুন পে স্কেল কার্যকর হওয়ার তারিখ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে গণ্য করার বিষয়ে নীতিগতভাবে আলোচনা চলছে। সে ক্ষেত্রে গেজেট পরে প্রকাশ হলেও কার্যকারিতা পূর্বের তারিখ থেকেই গণনা করা হবে। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ধিত বেতনের পাশাপাশি ১ জুলাই থেকে গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত সময়ের বকেয়া অর্থও একসঙ্গে পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
যদিও নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে সরকারি পর্যায়ে প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে, তবুও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক গেজেট বা সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হয়নি। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, বেতন বৃদ্ধির হার, ভাতা সমন্বয় কিংবা গেজেট প্রকাশের সম্ভাব্য সময়সূচিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য ও নীতিগত আলোচনার অংশ হিসেবেই বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
Leave a Reply