দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বা নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন এই বেতন কাঠামো কার্যকরের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ ধাপে রয়েছে। এখন শুধু প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা। অনুমোদন মিললেই আগামী জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে সরকারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন মূল বেতন কার্যকর করা হতে পারে। ইতোমধ্যে গঠিত পে কমিশন নতুন বেতন কাঠামোয় মূল বেতনে ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সরকার নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুই ধাপের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এ লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি পে কমিশনের দেওয়া সুপারিশগুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করছে। বিভিন্ন গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার, বাস্তবায়নের পদ্ধতি, বাজেটের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং কারিগরি বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই কমিটি তাদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে। এরপর সেই প্রতিবেদন অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি মিললেই অর্থ বিভাগ জুলাই মাসের মাঝামাঝি অথবা পরবর্তী সপ্তাহে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
বর্তমানে সরকারি চাকরিতে ২০টি গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামো চালু রয়েছে। নতুন পে স্কেলে এই গ্রেডগুলোর মূল বেতন পুনর্বিন্যাসের বড় ধরনের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১০ নম্বর গ্রেডে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন প্রায় ১০০ শতাংশ অথবা তার কিছুটা কম হারে বৃদ্ধি করার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে ১১ থেকে ২০ নম্বর গ্রেডে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে গড়ে ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত মূল বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হতে পারে। ফলে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পেতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়টি মাথায় রেখেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাজেটে এ খাতে ৪৪ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এই অর্থ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন, অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীদের পেনশন সমন্বয় এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়ের জন্য ব্যয় করা হবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল কার্যকর করার ঘোষণা দিলেও বাস্তবায়নের পদ্ধতি, ধাপ এবং অন্যান্য কারিগরি বিষয় পরবর্তীতে বিস্তারিতভাবে জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
উল্লেখ্য, দেশে সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর টানা প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। এ সময়ে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামসহ জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের বাস্তব আয় আগের তুলনায় কমে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান দূর করা, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে বেতন কাঠামোর সমন্বয় ঘটানো এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি মানসম্মত জীবনযাত্রা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই সরকার নতুন নবম জাতীয় পে স্কেল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
বর্তমানে সরকার প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর বেতন-ভাতা ও পেনশন বাবদ বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে। নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে এই ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে নতুন বেতন কাঠামো একবারে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হবে, নাকি দুই ধাপে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার আইবিএএসপ্লাসপ্লাস (iBAS++) সফটওয়্যারের কারিগরি সক্ষমতা ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হবে, সেটিই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে।
Leave a Reply