শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, একজন শিক্ষক বা চাকরিজীবীর জন্য নিয়মিত বেতন পাওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা তিনি ব্যক্তিগতভাবে উপলব্ধি করেন। তিনি বলেন, একটি পরিবারের জীবিকা নির্বাহ, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য মাসিক বেতনই প্রধান ভরসা। তাই এক মাসের বেতন বন্ধ হয়ে গেলে একজন শিক্ষক বা কর্মচারীকে কতটা দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা তিনি খুব ভালোভাবেই জানেন।
বুধবার (২৪ জুন) রাজধানীর আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আসন্ন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা উপলক্ষ্যে ঢাকা, ময়মনসিংহ, মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন কেন্দ্র সচিবদের নিয়ে এ সভার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এনটিআরসিএর মাধ্যমে মাদরাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৭ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতার জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়নি। ফলে যোগদান করার পরও তারা নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। এ কারণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন। তবে সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যেই এ সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
ড. এহছানুল হক মিলন বলেন, আগের সরকার এ বিষয়টি বিবেচনায় নেয়নি যে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন। ফলে তারা শিক্ষক নিয়োগ দিলেও সেই নিয়োগের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেনি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখতে পেয়েছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমন অনেক জটিলতা তৈরি করা হয়েছে, যা পরবর্তী সরকারের কার্যক্রম পরিচালনাকে কঠিন করে তুলেছে। তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্র এভাবে পরিচালিত হতে পারে না। আমরা এসব সমস্যার সমাধান করতে চাই এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে দেব না।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, শিক্ষকদের বেতন পরিশোধের জন্য তার হাতে ১০০ কোটি টাকা ছিল। সেই অর্থ তিনি জনতা ব্যাংকে প্রদান করেছেন। ফলে যেসব শিক্ষক ও কর্মচারীর ব্যাংক হিসাব জনতা ব্যাংকে রয়েছে, তারা ইতোমধ্যে বেতন পেয়েছেন। কিন্তু যাদের হিসাব অন্য ব্যাংকে, তারা এখনো বেতন পাননি। এজন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই দুঃখ প্রকাশের দায়িত্ব মূলত আগের সরকারের ছিল, কারণ সমস্যার সৃষ্টি তাদের সময়েই হয়েছে। কিন্তু তারা কখনো এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেনি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এভাবেই আমাদের বাংলাদেশ চলেছে দীর্ঘদিন।
শিক্ষা খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, শিক্ষা কার্যক্রমে সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, যদি বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের শিক্ষাজীবনের সময় নষ্ট হলে মোট হিসাবে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষাবর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্জনের সুযোগও পিছিয়ে যায়। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো শিক্ষা কার্যক্রমকে সঠিক সময়সূচির মধ্যে ফিরিয়ে আনা এবং শিক্ষার্থীদের সময়ের অপচয় রোধ করা। সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাবর্ষকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা জানুয়ারি মাসে আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। যদিও পরীক্ষা আরও কিছুটা পরে নেওয়ার সুযোগ ছিল, তবে রমজান মাস এবং ঈদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই মত দিয়েছেন যে রমজান ও ঈদের আগেই পরীক্ষা শেষ করা শিক্ষার্থীদের জন্য সুবিধাজনক হবে। তাই সবার মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই জানুয়ারিতে এসএসসি পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ড. এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত ঘাটতি পূরণে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে পাঠ্যক্রমের নির্ধারিত অংশ সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রি-টেস্ট পরীক্ষা এবং ইন-হাউস কোচিংয়ের ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের জন্য ইন-হাউস কোচিং পরিচালনা করতে হবে, যাতে পরীক্ষার্থীরা আরও ভালো প্রস্তুতি নিতে পারে।
এ সময় তিনি প্রধান শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, স্থানীয় পরিচালনা কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজন হলে শিক্ষকদের জন্য সম্মানীর ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদের অতিরিক্ত পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করেই শিক্ষার্থীদের জন্য এই কোচিং কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি আরও জোরদার হবে এবং তারা আসন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হবে।
Leave a Reply