এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের মে মাসের বেতন-ভাতা এখনো ছাড় না হওয়ায় সারা দেশে গভীর উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজীজী।
সোমবার (১৬ জুন) রাতে নিজের ফেসবুক লাইভে দেওয়া বক্তব্যে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-সংক্রান্ত সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেন। একইসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এবং জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্থাপনের পর প্রাপ্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার আলোচনার বিষয়ও তিনি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
অধ্যক্ষ আজীজী বলেন, জুন মাসের ১৬ তারিখ পেরিয়ে গেলেও এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের মে মাসের বেতন এখনো ছাড় হয়নি। বিষয়টি নিয়ে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ডেপুটি সেক্রেটারি মাহমুদুল হকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। আলোচনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাকে জানিয়েছেন, মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন প্রদানের জন্য নির্ধারিত অর্থনৈতিক কোডে অর্থসংকট দেখা দিয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেতন ছাড় দেওয়া সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও জানান, সংকট নিরসনের জন্য কারিগরি শিক্ষা খাতের কিছু উদ্বৃত্ত অর্থ মাদ্রাসা খাতে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে স্থানান্তরিত অর্থ দিয়ে পুরো বেতন-ভাতা পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে বেতন প্রদানের প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমস্যার সমাধানে কাজ করছে বলেও তাকে জানানো হয়েছে।
লাইভ বক্তব্যে অধ্যক্ষ আজীজী বলেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে তিনি যে তথ্য পেয়েছেন, তাতে জুন মাসের মধ্যেই বেতন পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বরং মে ও জুন—এই দুই মাসের বেতন একত্রে আগামী জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে পরিশোধের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে তাকে জানানো হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, বিষয়টি জাতীয় সংসদেও উত্থাপন করা হয়েছে। রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল আমিন সংসদে মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন জটিলতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তবে সংসদে আলোচনার পরও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কার্যকর নির্দেশনা বা সমাধান পাওয়া যায়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজীজী বলেন, দেশের প্রায় দুই লাখ এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারী বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছেন। ঈদুল আজহার পর দীর্ঘ সময় ধরে বেতন না পাওয়ায় অনেক পরিবার মানবেতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষ করে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত এবং নিম্ন বেতনভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষক বা কর্মচারী মাসের পর মাস দায়িত্ব পালন করেও সময়মতো বেতন না পেলে তার পরিবার পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকের ঘরভাড়া, সন্তানের শিক্ষা ব্যয়, চিকিৎসা খরচ এবং দৈনন্দিন সংসার পরিচালনায় সংকট দেখা দিয়েছে। তাই এ পরিস্থিতির জন্য যদি কোনো প্রশাসনিক অবহেলা, সমন্বয়হীনতা বা দায়িত্বে গাফিলতি দায়ী হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
একইসঙ্গে তিনি বিশেষ ব্যবস্থায় দ্রুত বেতন ছাড়ের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শিক্ষক-কর্মচারীদের দুর্ভোগ কমাতে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অর্থ শাখার কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে অধ্যক্ষ আজীজী আরও বলেন, সরকারের আনুষ্ঠানিক জিও (GO) বা সরকারি আদেশ ছাড়া বেতন-ভাতা ছাড় করা সম্ভব নয়। এ কারণে অধিদপ্তর বর্তমানে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানে সৃষ্ট সমস্যার বিষয়ে রাতে একটি ব্যাখ্যামূলক বিবৃতি প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানের সমস্যাটি দ্রুততম সময়ে সমাধানের জন্য বর্তমান সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে ‘মাদ্রাসা এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (এমইএমআইএস) সাপোর্ট (২য় সংশোধিত) (প্রস্তাবিত ৩য় সংশোধন)’ প্রকল্পে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করে গত ৯ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে বেতন-ভাতা প্রদানের বর্তমান জটিলতা সহজেই সমাধান করা সম্ভব হবে বলে মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ২০১৭ সালে ‘মাদ্রাসা এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (এমইএমআইএস)’ প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়েছিল। সে সময় প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১০ কোটি ১২ লাখ টাকা। কিন্তু তৎকালীন সরকারের সময়ে প্রকল্পটি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) কার্যক্রম বাদ দিয়ে অনুমোদন করা হয়। এর ফলে মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের প্রক্রিয়া কাঙ্ক্ষিতভাবে আধুনিকায়ন করা সম্ভব হয়নি এবং পরবর্তীতে বেতন প্রদান কার্যক্রমে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা তৈরি হয়।
মন্ত্রণালয় জানায়, গত ৯ জুন একনেকে প্রকল্পটির সংশোধনী অনুমোদন দেওয়ার মাধ্যমে সেই সীমাবদ্ধতা দূর করার পথ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সংশোধিত প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, অতীতে এই প্রকল্পের আওতায় দেশের আটটি বিভাগে নির্বাচিত আটটি মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলটিং) ইএফটির মাধ্যমে বেতন-ভাতা প্রদানের কার্যক্রম চালু করা হয়েছিল। কিন্তু ওই আটটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের অন্যান্য মাদ্রাসাগুলোতে এখনো ম্যানুয়াল বা অ্যানালগ পদ্ধতিতে বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হচ্ছে। ফলে বেতন প্রক্রিয়াকরণ ও অর্থ ছাড়ে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।
তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আশা প্রকাশ করে জানিয়েছে, নতুন সংশোধনী বাস্তবায়নের মাধ্যমে খুব দ্রুতই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে এবং ভবিষ্যতে মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানের কার্যক্রম আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর হবে।
Leave a Reply