ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি করার অভিযোগে ৭৩ জন শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা অধিদপ্তর। একই সঙ্গে ভুয়া সনদের মাধ্যমে সরকারি অর্থ গ্রহণের দায়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে মোট ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫৬ হাজার ৭৬৭ টাকা আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে এ প্রতিবেদন জমা দেন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) শিক্ষা পরিদর্শক সনজয় চন্দ্র মন্ডল, সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মো. নুরুল আফছার এবং অডিটর মো. সিরাজুল ইসলাম। এর আগে গত ১৮ মে শিক্ষা বিষয়ক দেশের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম দৈনিক শিক্ষাডটকম এবং শিক্ষা বিষয়ক জাতীয় প্রিন্ট পত্রিকা দৈনিক আমাদের বার্তায় বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছিল।
ডিআইএ’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্কুল শাখায় বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৩০ জন এবং কলেজ শাখায় শিক্ষার্থী রয়েছে ৮৫ জন। পরিদর্শন শেষে কলেজ শাখার অধ্যক্ষসহ ৬১ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে স্কুল শাখার সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ আরও ১২ জনের বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছে। তবে অর্থ ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে মোট ৯ জনের বিরুদ্ধে।
প্রতিবেদনের আর্থিক মন্তব্য ও সুপারিশ অংশে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করা হয় না। অথচ প্রতি বছর আয়-ব্যয়ের হিসাবের ভিত্তিতে বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করা বাধ্যতামূলক। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন করার কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হচ্ছে না। হাতে নগদ অর্থ রেখে ব্যয় না করে ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন ও ব্যয়ের নির্দেশনা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি তা মানেনি। ভর্তি ফি, মাসিক বেতন, ফরম পূরণসহ বিভিন্ন খাতে আদায়কৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যাংকে জমা দেওয়ার নিয়মও অনুসরণ করা হয়নি।
ডিআইএ কর্মকর্তারা আরও উল্লেখ করেন, প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটি থাকলেও তা নিয়মিতভাবে কার্যকর নয়। প্রতি তিন মাস অন্তর নিরীক্ষা কমিটি গঠন করে প্রতিষ্ঠানের সব আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করার কথা। নিরীক্ষা শেষে খাতওয়ারি অর্থের পরিমাণ উল্লেখ করে প্রতিবেদন কমিটির সভায় উপস্থাপন করার বিধান রয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব শিক্ষককে এই কমিটির আওতায় আনারও নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি।
পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ের ভাউচার যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। ভাউচারে রাজস্ব স্ট্যাম্প ব্যবহারের বিধান থাকলেও তা মানা হয়নি। অনেক ব্যয় ভাউচার ছাড়াই নগদ অর্থে সম্পন্ন করা হয়েছে। বেসরকারি আদায়ের জন্য কোনো রেজিস্টার সংরক্ষণ করা হয়নি এবং বেসরকারি ব্যয়ের রেজিস্টারও ব্যবহার করা হয় না। ব্যয়ের ভাউচারগুলো কমিটির অনুমোদন নিয়ে গার্ড ফাইলে সংরক্ষণের কথা থাকলেও তারও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ক্যাশ বই যাচাই করে দেখা যায়, সেটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়নি। আয়-ব্যয়ের হিসাব যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করা হয় না এবং আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুস্বাক্ষরও নেই। বেসরকারি আয় গ্রহণের ক্ষেত্রে মেমো নম্বর এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভাউচার নম্বর উল্লেখ করার বিধান থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হিসাব নির্দেশিকা অনুযায়ী কলামভিত্তিক ক্যাশ বই সংরক্ষণ, তাৎক্ষণিক হিসাব এন্ট্রি এবং নিয়মিত অনুস্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি তা পালন করেনি।
পরিদর্শনকালে নিরীক্ষা কর্মকর্তারা দেখতে পান, প্রতিষ্ঠানের সাধারণ তহবিলে মাত্র ৩ হাজার ৫৪৫ টাকা জমা রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের ক্রয় কার্যক্রম ক্রয় কমিটির মাধ্যমে সম্পন্ন করার নিয়ম থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। ক্রয়কৃত মালামাল যথাসময়ে স্টক রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যেকোনো অর্থ আদায় রশিদের মাধ্যমে করার এবং রশিদ বইয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার নির্দেশনা থাকলেও তার ব্যত্যয় ঘটেছে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে রাজস্ব স্ট্যাম্প ব্যবহারের বিধানও মানা হয়নি।
ডিআইএ কর্মকর্তারা তহবিল ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর অনিয়মের কথা উল্লেখ করেছেন। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষক-কর্মচারীদের নামে কোনো ভবিষ্য তহবিল (প্রভিডেন্ট ফান্ড) চালু নেই।
বিগত পরিদর্শনের বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর একই প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন ও তদন্ত করেছিল ডিআইএ। তবে সেই তদন্ত প্রতিবেদনের দফাওয়ারি জবাব বা সংশ্লিষ্ট কোনো রেকর্ডপত্র বর্তমান পরিদর্শনের সময় প্রতিষ্ঠান প্রধান উপস্থাপন করতে পারেননি।
মামলা সংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠান প্রধান লিখিতভাবে জানিয়েছেন যে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন রেকর্ডপত্র ও তথ্য জাল-জালিয়াতির অভিযোগে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হালুয়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে একটি এজাহার দায়ের করেন। ওই মামলার প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হক পুলিশ হেফাজতে গেলে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।
প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে কত টাকা ফেরত আদায় করতে হবে, তারও বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হয়েছে।
কলেজ শাখার অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হককে ৪১ লাখ ২১ হাজার ২৬১ টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া প্রভাষক তানজিলা ইসলাম লিজা, মো. আবু রায়হান, মোস্তাফিজুর রহমান, লুৎফা তালুকদার, মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, তৌহিদা বেগম, মো. শহীদুল আলম, মো. তৌহিদুজ্জামান আকন্দ, মাহমুদা আক্তার, লুবানা জাহান, মো. হাফিজুর রহমান, আবু সাঈদ, খন্দকার শামছুল হুদা এবং মুহাম্মদ আজিজুল হক—প্রত্যেককে ১২ লাখ ১২ হাজার ৯৯ টাকা করে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রভাষক মো. জাবরুল ইসলামকে ৬ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ টাকা, মো. কামরুল ইসলামকে ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৪২৮ টাকা, মোহাম্মদ লুৎফর রহমানকে ১২ লাখ ৪১ হাজার ৫৮২ টাকা, মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ হাসানকে ১২ লাখ ৮১ হাজার ৫৮২ টাকা, মোহাম্মদ এরশাদ আলীকে ১২ লাখ ৪১ হাজার ৫৮২ টাকা এবং বিপুল দেবনাথকে ১২ লাখ ১২ হাজার ৯৯ টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে।
এছাড়া মোস্তফা হাসান, শাহানাজ পারভীন, মো. ফারুক খাঁন, বিউটি রানী সরকার ও শফিকামালকে ২ লাখ ৩২ হাজার ৫৮ টাকা করে, ছিদ্দিকুন নাহারকে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৯৭২ টাকা, নাসরিন আক্তার ও রেহানা পারভীনকে ৪ লাখ ২১ হাজার ৯২৮ টাকা করে, মো. আলমগীর হোসেনকে ২ লাখ ৯২ হাজার ১০৪ টাকা, মো. ফজলুল হক ও মো. হাফিজুল ইসলামকে ২ লাখ ৩২ হাজার ৬০ টাকা করে, শেফালী খাতুনকে ৩৪ হাজার ৭৮ টাকা এবং মো. খাইরুল বাশারকে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৪৭২ টাকা ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রভাষক মো. সেলিমকে ২ লাখ ৩২ হাজার ৬০ টাকা, সহকারী শিক্ষক পলাশ চন্দ্র সরকারকে ৬ লাখ ১৫ হাজার ৫৩০ টাকা, প্রদর্শক নুপুর রানী মিশ্র, মোহাম্মদ সোহাগ মিয়া, আফরিন জাহান ও ফাতেমা তুজ জহরাকে ৮ লাখ ৯১ হাজার ২৮৪ টাকা করে, মাহফুজুর রহমানকে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৫৭৬ টাকা, সহকারী গ্রন্থাগারিক রেফাজ উদিনকে ১ লাখ ৭১ হাজার ৭০০ টাকা এবং মো. আহসান উল্যাহকে ৮ লাখ ৯১ হাজার ২৮৪ টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে।
এছাড়া অফিস সহকারী মো. আমিনুল হক, আসাদুজ্জামান এবং হিসাব সহকারী মো. আব্দুল্লাহ আল ফাহিমকে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৯ টাকা করে, ল্যাব সহকারী ইমরুল হাসান কায়েসকে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৭৯৬ টাকা, ইসরাত জাহানকে ৩ লাখ ৯ হাজার ৮৯৬ টাকা, সুসমিতা আক্তার জেরিনকে ৩ লাখ ৯ হাজার ৩৬৮ টাকা, শেফালী বেগমকে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ১৩২ টাকা ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অফিস সহায়ক মো. জুয়েল মিয়াকে ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৬২০ টাকা, সুজন মিয়াকে ৪ লাখ ৯১ হাজার ৬৫৫ টাকা, মো. আমিনুল ইসলামকে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৬৫৫ টাকা, আরিয়ান হাসানকে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৮৩ টাকা, নিরাপত্তা কর্মী রাকিবুল হাসান রনিকে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯৩৭ টাকা, মো. জাকারিয়া ইসলামকে ৬৮ হাজার ৮২২ টাকা, কম্পিউটার অপারেটর আশরাফুন নাহারকে ৭৬ হাজার ৫৭৬ টাকা, নিরাপত্তা কর্মী মোস্তফা কামালকে ৭৬ হাজার ৩৫০ টাকা এবং অফিস সহায়ক রিফাত হাসানকে ৭৬ হাজার ৩৫১ টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে।
কলেজ শাখায় মোট ফেরতের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ কোটি ২১ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬৬ টাকা।
অন্যদিকে স্কুল শাখায় সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আরিফ রববানীকে ৭ লাখ ১ হাজার ৮৭৭ টাকা, সহকারী শিক্ষক আছাদুজ্জামানকে ৮ লাখ ৫ হাজার ১৯৪ টাকা, শামছুন নাহারকে ৩৭ লাখ ১১ হাজার ৭৩৮ টাকা, নাসরীন সুলতানাকে ২৮ লাখ ৭১ হাজার ৭৪৮ টাকা, আয়েশা খাতুনকে ৩২ লাখ ৮৯ হাজার ২৬০ টাকা, অফিস সহায়ক ইসমেতারাকে ৫ লাখ ৬০ হাজার ৮১৫ টাকা, পরিচ্ছন্নতা কর্মী আবু নাঈমকে ৫ লাখ ৬০ হাজার ৭২৩ টাকা, আয়া ঝর্ণা আক্তারকে ৫ লাখ ৬০ হাজার ৭২৩ টাকা এবং নৈশ প্রহরী তরিকুল ইসলামকে ৫ লাখ ৬০ হাজার ৭২৩ টাকা ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
স্কুল শাখায় মোট ফেরতের পরিমাণ ১ কোটি ৩৬ লাখ ২২ হাজার ৮০১ টাকা। ফলে কলেজ ও স্কুল শাখা মিলিয়ে জাল সনদ ও অনিয়মের মাধ্যমে গ্রহণ করা অর্থের সর্বমোট ফেরতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫৬ হাজার ৭৬৭ টাকা।
Leave a Reply