এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত বদলি কার্যক্রম শুরুর আগেই প্রযুক্তিগত জটিলতায় চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন দেশের হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী। তথ্য সংগ্রহের জন্য চালু করা অনলাইন সফটওয়্যারটির সার্ভার বারবার বিকল হয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনেকেই প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিতে পারেননি। ফলে বদলি কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ, হতাশা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষক সমাজে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সূত্রে জানা গেছে, বদলি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত সফটওয়্যারের সার্ভার সক্ষমতা বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সার্ভার স্পেস বাড়ানোর কাজ শেষ হলে দ্রুত সফটওয়্যারটি পুনরায় চালু করা হবে এবং শিক্ষক-কর্মচারীরা তথ্য জমা দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
মাউশির উপপরিচালক (মাধ্যমিক) ইউনুস ফারুকী জানান, কারিগরি ত্রুটির কারণে সফটওয়্যারটি সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। তবে সমস্যা সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সার্ভার আপগ্রেডের কাজ সম্পন্ন হলেই সফটওয়্যারটি আবার চালু করা হবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সফটওয়্যারটির সার্ভার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দ্রুত সচল করার জন্য টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডকে ‘অতীব জরুরি’ উল্লেখ করে চিঠি দেয় মাউশি। চিঠিতে বলা হয়, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (স্কুল ও কলেজ) কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক বদলি নীতিমালা-২০২৬ (সংশোধিত)’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে টেলিটকের কারিগরি সহায়তায় একটি স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারীদের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই এবং নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী বদলি সম্পন্ন করা হবে।
তবে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু হওয়ার পরপরই নানা ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যা সামনে আসে। শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা অভিযোগ করেন, সফটওয়্যারে প্রবেশ করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে লগইন করলেও তথ্য সংরক্ষণ হয়নি। আবার কারও ক্ষেত্রে তথ্য পূরণের শেষ ধাপে গিয়ে সার্ভার ডাউন হয়ে যাওয়ায় সব তথ্য পুনরায় দিতে হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষকরা জানিয়েছেন, সফটওয়্যারের জটিলতার কারণে তারা দিনের পর দিন কম্পিউটারের সামনে বসে থেকেও তথ্য জমা দিতে পারেননি। অনেক প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে রাত গভীর পর্যন্ত চেষ্টা করতে হয়েছে। কেউ কেউ তথ্য আপলোডের জন্য সাইবার ক্যাফে বা কম্পিউটার সেন্টারের দ্বারস্থ হয়েছেন। এতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
বিশেষ করে দূরবর্তী ও গ্রামীণ এলাকার শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় সফটওয়্যার সচল হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। সার্ভার সমস্যার কারণে একাধিকবার তথ্য ইনপুট দিতে গিয়ে মানসিক চাপেরও মুখে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষক নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করে বদলি কার্যক্রম চালু করায় সরকার প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া সফটওয়্যার চালু করায় পুরো প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়েছে। লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর তথ্য একসঙ্গে গ্রহণ করার মতো সক্ষমতা নিশ্চিত না করেই তথ্য সংগ্রহ শুরু করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
একাধিক শিক্ষক সংগঠনের নেতারা জানান, তথ্য দেওয়ার সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে সার্ভার অচল হয়ে যাওয়ায় অনেক যোগ্য শিক্ষক বদলির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। তারা সফটওয়্যার সম্পূর্ণ সচল না হওয়া পর্যন্ত তথ্য জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে মাউশির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সফটওয়্যারটি পুনরায় চালু হওয়ার পর যেসব শিক্ষক তথ্য দিতে পারেননি তাদের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হবে। পাশাপাশি সার্ভারের সক্ষমতা বাড়িয়ে ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের সমস্যা না হয় সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষকরা বলছেন, বদলি কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হলো স্বচ্ছতা ও হয়রানি কমানো। কিন্তু সফটওয়্যারজনিত জটিলতায় বর্তমানে উল্টো হয়রানি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দ্রুত প্রযুক্তিগত সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং সময়সীমা বৃদ্ধি করা না হলে হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর আশা, সার্ভার আপগ্রেড ও কারিগরি ত্রুটি নিরসনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন হবে। এরপর সফটওয়্যারটি পুনরায় চালু হলে শিক্ষক-কর্মচারীরা নির্বিঘ্নে তথ্য জমা দিতে পারবেন এবং বহু প্রতীক্ষিত বদলি কার্যক্রমও গতিশীল হবে।
Leave a Reply