দীর্ঘ ১১ বছর পর দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। নানা জল্পনা-কল্পনা ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে নবম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন শুরু হবে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মচারীরা প্রায় এক যুগ ধরে একই বেতন কাঠামোর আওতায় বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন। সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় বেতনকাঠামো কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এর পরবর্তী সময়ে দেশে মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তব্যে বলেন, “সরকারি কর্মচারীরা গত প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামোর আওতায় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সে বাস্তবতা বিবেচনায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামোগত বৈষম্য কমিয়ে সমতাভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার বহুমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। নতুন বেতন কাঠামোও সেই সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি অংশ।
অর্থমন্ত্রীর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল আগামী মাস থেকেই কার্যকর করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।
বর্তমানে কার্যকর অষ্টম জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা। তবে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নতুন বেতনকাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ হিসাবে সর্বনিম্ন বেতন প্রায় আড়াই গুণ এবং সর্বোচ্চ বেতন দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতনের মধ্যে অনুপাত রাখা হয়েছে প্রায় ১:৮। বর্তমানে এই অনুপাত ১:৯.০৭৬। আগের পে-স্কেলগুলোতেও প্রায় একই ধরনের ভারসাম্য বজায় রাখা হয়েছিল।
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে প্রায় সব গ্রেডের মূল বেতন দ্বিগুণ থেকে আড়াইগুণ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, নতুন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সর্বনিম্ন গ্রেডের একজন কর্মচারী মূল বেতনের পাশাপাশি বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা যোগ করে মাসিক মোট প্রায় ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা পর্যন্ত সুবিধা পেতে পারেন।
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী—
এ ছাড়া—
অন্যদিকে—
এছাড়া নিম্ন গ্রেডগুলোতে প্রস্তাব করা হয়েছে—
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশগুলো পর্যালোচনার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি কমিশনের প্রস্তাবগুলো বিশ্লেষণ করে নতুন বেতনকাঠামো তিন ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, নবম জাতীয় পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।
এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এবং জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য পৃথক একটি স্টেপ (Step) বা অতিরিক্ত বেতনধাপ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ পরবর্তীতে এ বিষয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
চলতি বছরের বাজেট সংক্ষিপ্তসারের ‘বিবরণী-২ খ’-এ পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতাদি বাবদ আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মোট ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে একই খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৫ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা।
আবার বাজেট সংক্ষিপ্তসারের ‘বিবরণী-৪’-এ পরিচালন ব্যয়ের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বেতন-ভাতা বাবদ আগামী অর্থবছরের জন্য ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। যেখানে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৪ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা।
বাজেটের সম্পদের ব্যবহার অংশে ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে আগামী অর্থবছরের জন্য ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ বরাদ্দ ছিল ৮৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা।
সে হিসাবে জনপ্রশাসন খাতে বরাদ্দ বেড়েছে ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত এই ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকার মধ্যে অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী এবং পেনশনভোগীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নে ব্যয় করা হবে।
সরকার নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জনসেবা খাতে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে যাচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের ৭২ হাজার ২৪ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৯৬ শতাংশ বেশি।
যদিও পরে সংশোধিত বাজেটে এ বরাদ্দ বাড়িয়ে ৮৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা করা হয়েছিল, তারপরও নতুন অর্থবছরের বরাদ্দ সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা বেশি।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অতিরিক্ত বরাদ্দের পুরো অর্থ শুধু সরকারি কর্মচারীদের বর্ধিত বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হবে না। এর মধ্যে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের বেতন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি, পেনশনভোগীদের অতিরিক্ত সুবিধা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ফলে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী ও পেনশনভোগীরাও আর্থিকভাবে উপকৃত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
Leave a Reply