দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ধরে আটকে থাকা এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ভাতা ও কল্যাণসুবিধা প্রদানের জটিলতা অবশেষে নিরসনের পথে এগোচ্ছে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, হতাশা ও অনিশ্চয়তার পর হাজার হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর জন্য স্বস্তির খবর এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অবসরসুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে বর্তমানে জমা থাকা অর্থ থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েক হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে তাদের প্রাপ্য সুবিধা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবসরসুবিধা বোর্ডের পক্ষ থেকে প্রথমে প্রায় আট হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে আংশিক অবসরসুবিধা হিসেবে জনপ্রতি পাঁচ লাখ টাকা করে দেওয়ার একটি প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই, তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর প্রাথমিকভাবে ৩ হাজার ১০০ জন শিক্ষক-কর্মচারীর জন্য অর্থ ছাড়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকেও প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে কল্যাণসুবিধা প্রদানের কার্যক্রম প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। যদিও যাচাই-বাছাই শেষে এই সংখ্যায় সামান্য পরিবর্তন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসরসুবিধা বোর্ডের তহবিলে প্রায় ১ হাজার ৮২ কোটি টাকা জমা রয়েছে। একই সময়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের তহবিলে জমা রয়েছে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। এছাড়া চলমান বিভিন্ন উৎস থেকে আরও কিছু অর্থ তহবিলে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে অদূর ভবিষ্যতে এই দুই প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা মোট অর্থের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণ তহবিলের প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে লোপাট হয়ে যায়। এই বিপুল অর্থের সংকটের কারণেই অবসর ও কল্যাণসুবিধা প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে পড়ে। এর ফলে চাকরি থেকে অবসরে যাওয়া হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হন। অনেকেই অবসরের পর বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও প্রাপ্য অর্থ পাননি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পেনশনের টাকা সংগ্রহের জন্য তাদের বিভিন্ন দপ্তরে বারবার যোগাযোগ করতে হয়েছে, যা তাদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ অবস্থায় শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের এই মানবিক সংকট নিরসনে বর্তমান বিএনপি সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অবসর ও কল্যাণসুবিধা সংক্রান্ত জটিলতা দূর করার উদ্যোগ নেয় এবং পর্যায়ক্রমে আটকে থাকা অর্থ পরিশোধের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। আপাতত অবসরসুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের হাতে থাকা জমাকৃত অর্থ ব্যবহার করে কয়েক হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে তাদের প্রাপ্য সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এই খাতে অর্থসংকট দূর করতে সরকার নতুন করে অবসরসুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের অনুকূলে দুই হাজার কোটি টাকার বন্ড বরাদ্দ দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, আসন্ন জাতীয় বাজেটেও এ খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা আবেদনগুলো ধাপে ধাপে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক জানান, শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণসুবিধা সংক্রান্ত সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের জন্য ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করবে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ছয় লাখেরও বেশি। তাদের অবসর ও কল্যাণসুবিধা দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণসুবিধা প্রদান করে থাকে। অন্যদিকে অবসর-পরবর্তী আর্থিক সুবিধা বা অবসরভাতার অর্থ প্রদান করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসরসুবিধা বোর্ড। দীর্ঘদিন ধরে এই দুই প্রতিষ্ঠানে জমে থাকা আবেদন এবং অর্থসংকটের কারণে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হলেও বর্তমানে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার আশা দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হয়নি শুধু ভবিষ্যৎ আশাবাদ এর মধ্যেই আটকে আছে