শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম, ত্রুটি বা কোনো ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগের বিষয়ে সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পদক্ষেপ নিয়েছে। এ অভিযোগ তদন্তে ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় এবং পরীক্ষায় ত্রুটি প্রমাণিত হয়, তাহলে পুরো পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হবে।
সম্প্রতি দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
সাক্ষাৎকারে শিক্ষামন্ত্রী জানান, প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ নিয়োগের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় প্রায় ৫৩ হাজার প্রার্থী অংশগ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ পদে মোট ১১ হাজার ১৫০টি শূন্য পদ রয়েছে। এসব পদে নতুন পদ্ধতিতে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে পরীক্ষাটি নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন ও অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। সেই অভিযোগগুলোর যথার্থতা যাচাই করতে তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তদন্তে যদি কোনো ধরনের ত্রুটি, অনিয়ম বা অসঙ্গতি পাওয়া যায়, তাহলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং প্রয়োজনে পুরো পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা আয়োজন করা হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির হাতে। কিন্তু সেই ব্যবস্থায় নানা ধরনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে ছিল। এসব সমস্যা দূর করতে সরকার পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা বাতিল করেছে। এখন লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতা যাচাই করে নিবন্ধিত শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্য থেকেই শিক্ষক নিয়োগ করা হচ্ছে। এর ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
নিবন্ধন সনদধারীদের চাকরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বা নিবন্ধন সনদ অর্জন করলেই চাকরি নিশ্চিত হয়ে যায় না। নিবন্ধন সনদ মূলত একজন প্রার্থীর শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের প্রাথমিক যোগ্যতার স্বীকৃতি। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ২০০১ সালে তার দায়িত্ব পালনকালের সময়ই শিক্ষক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর আদলে শিক্ষকতাকে একটি পেশাগত মানদণ্ডের আওতায় আনতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, যেমন একজন চিকিৎসককে চিকিৎসা পেশায় প্রবেশের আগে নির্দিষ্ট যোগ্যতা অর্জন করতে হয়, একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টকে পেশাগত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়, তেমনি শিক্ষকতার ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।
এহছানুল হক মিলন বলেন, অতীতে নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিরা সনদ অর্জনের পর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবেদন করতেন এবং পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ পেতেন। কিন্তু নিয়োগের ওই পর্যায়ে নানা ধরনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি হতো। বর্তমানে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। পরিচালনা কমিটির নিয়োগ-সংক্রান্ত ক্ষমতা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং শূন্য পদে সরাসরি এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বিষয়ে তিনি বলেন, নিয়োগের পরপরই শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। দক্ষ ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, বরিশালের একজন শিক্ষককে যদি চাকরির শুরুতেই চাঁদপুরের কচুয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে তার জন্য নানা ধরনের পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। এ কারণে শিক্ষক বদলির সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষকরা নিজ এলাকার কাছাকাছি কর্মস্থলে যাওয়ার সুযোগ পান।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, শিক্ষক বদলির পুরো প্রক্রিয়াকে সফটওয়্যারভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তি, কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে আর্থিক লেনদেন বা তদবিরের সুযোগও বন্ধ হয়ে যাবে। নির্ধারিত নীতিমালা ও তথ্যের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলি সম্পন্ন হবে। শুধু প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষ নয়, স্কুল ও কলেজের অন্যান্য শিক্ষকদের বদলিও একই সফটওয়্যারনির্ভর পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে।
তদবিরের সুযোগ থাকবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বাস্তবতায় বিভিন্ন ব্যক্তি বা পক্ষ থেকে সুপারিশ কিংবা তদবিরের চেষ্টা থাকতেই পারে। তবে একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু হলে কোনো তদবিরই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারবে না। কারণ পুরো প্রক্রিয়া নির্ধারিত নিয়ম, তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
সাক্ষাৎকারে শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান সরকার শিক্ষক নিয়োগ, বদলি এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। একই সঙ্গে বেসরকারি শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা ও কল্যাণমূলক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের শতভাগ মূল বেতন প্রদান করছে। পাশাপাশি উৎসব ভাতা ৫০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। চলতি বছর উৎসব ভাতায় আরও ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হবে। ধাপে ধাপে এই উৎসব ভাতা শতভাগে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া শিক্ষকদের চিকিৎসা ভাতা, বাড়িভাড়া এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধাও পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি। এসব সুযোগ-সুবিধা পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগ, কর্মস্থল নির্ধারণ এবং বদলির ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি ও মানবিক দিকগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
Leave a Reply