শিক্ষাবিদ থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই মনে করে আসছেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হলে শিক্ষকদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলেও মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, দেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা এখনও তুলনামূলকভাবে কম বেতন পান। চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও তাদের জন্য খুবই সীমিত। ফলে শিক্ষক সমাজের মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করছে।
এই প্রেক্ষাপটে এমপিওভুক্তসহ সব পর্যায়ের শিক্ষকদের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। সম্প্রতি একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি শিক্ষকদের আর্থসামাজিক অবস্থা, মর্যাদা, প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রণীত নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে “সুশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষক” বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো দেশ যদি সত্যিকার অর্থে সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে সেখানে অবশ্যই মেধাবী শিক্ষক প্রয়োজন হবে। আর মেধাবী শিক্ষক তৈরি ও ধরে রাখতে হলে তাদের জন্য উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষকরা যেন আর্থিক সংকট বা সামাজিক অবমূল্যায়নের মধ্যে না থাকেন, সে বিষয়েও সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে। কারণ, একজন শিক্ষক যদি মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে না পারেন, তাহলে তিনি পুরোপুরি মনোযোগ দিয়ে শিক্ষাদান করতে পারবেন না। এজন্য শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক বেতন, সামাজিক মর্যাদা এবং আর্থসামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন মাউশি মহাপরিচালক। তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক মেধাবী তরুণ শিক্ষকতা পেশায় আসতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। কারণ, এ পেশায় কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা নেই। তিনি মনে করেন, শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করতে হলে শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় করা এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
ড. সোহেল বলেন, শুধু বেসরকারি শিক্ষক নয়, সরকারি, প্রাথমিক এবং অন্যান্য সব পর্যায়ের শিক্ষকদেরও একটি সম্মানজনক সামাজিক অবস্থান থাকা উচিত। তাদের এমন আর্থসামাজিক অবস্থা নিশ্চিত করতে হবে যাতে তারা অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে না থাকেন। একজন শিক্ষক যেন আত্মমর্যাদা নিয়ে কাজ করতে পারেন এবং নিজের অবস্থান নিশ্চিত করে শিক্ষাদানে আরও বেশি মনোযোগী হতে পারেন—সেই পরিবেশ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অনেক শিক্ষক হতাশার মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে যারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করে শিক্ষকতা পেশায় এসেছেন, তাদের মধ্যে এই হতাশা বেশি দেখা যায়। তাদের বক্তব্য হলো—যেহেতু তারা কঠিন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এই পেশায় এসেছেন, সেহেতু তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ডেডিকেশন বা আন্তরিকতা প্রত্যাশা করা হলে, রাষ্ট্রকেও তাদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
মাউশি মহাপরিচালক আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষকদের জন্য নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষকদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টিচার্স-স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম চালু, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা পরিবেশ তৈরি এবং শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের নানা কর্মসূচি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে পরিকল্পিত উন্নয়ন করতে হলে দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী কতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকা উচিত, শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত কেমন হওয়া দরকার এবং কোন প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের অবকাঠামো প্রয়োজন—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক বেশি রয়েছে, আবার কোথাও শিক্ষার্থী বেশি হলেও শিক্ষক সংকট রয়েছে। এই ভারসাম্যহীনতা দূর করা গেলে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উভয়ের জন্যই সুষম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সবশেষে তিনি বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবাই যদি সম্মিলিতভাবে রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করে, তাহলে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়ন আরও দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
Leave a Reply