দেশের বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত জাল বা ভুয়া সনদধারী শিক্ষক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) কর্তৃক শনাক্ত হওয়া ৪৭১ জন জাল সনদধারীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম শুরু করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের এমপিও সুবিধা বাতিল, স্থগিত এবং নিয়োগ বাতিলের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সম্প্রতি মাউশির বেসরকারি কলেজ শাখা-৩ থেকে জারি করা একটি দাপ্তরিক আদেশে এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এক শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) প্রদান করা হয়েছে। সহকারী পরিচালক মো. মাঈন উদ্দিন স্বাক্ষরিত ওই আদেশে বলা হয়, গত ১৫ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা শাখা থেকে জাল ও ভুয়া সনদধারী শিক্ষক-কর্মচারীদের একটি তালিকা মাউশিতে পাঠানো হয়।
মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো ওই তালিকায় মোট ৪৭১ জন শিক্ষক ও কর্মচারীর নাম রয়েছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ৪০২ জন, কলেজ পর্যায়ে ৬৪ জন এবং কারিগরি পর্যায়ে রয়েছেন আরও ৫ জন। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তে বিভিন্ন ধরনের জাল বা ভুয়া সনদ ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঠানো নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) এর জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী তালিকাভুক্ত এসব জাল সনদধারীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগকে অবহিত করার জন্যও মাউশিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার দেওগাঁও বকুল তলা ডিগ্রি কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক মো. সাদেকুল ইসলামকে শোকজ নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রেরিত জাল সনদধারীদের তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) এর জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫’-এর ১৮.১(ঙ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেন তার এমপিও সুবিধা বাতিল বা স্থগিত করা হবে না এবং কেন গভর্নিং বডি কর্তৃক তার নিয়োগ বাতিল করা হবে না—সে বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে। নোটিশ পাওয়ার পর ১০ কর্মদিবসের মধ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে জবাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাকে।
এদিকে বিষয়টি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর ও কর্মকর্তার কাছেও আদেশের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অঞ্চলের পরিচালক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সভাপতি এবং অধ্যক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) কর্তৃক পরিচালিত নিবন্ধন পরীক্ষার সনদ বাধ্যতামূলক। কিন্তু ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত ৪৭১ জনের মধ্যে ১৯৪ জন শিক্ষক-কর্মচারীর শিক্ষক নিবন্ধন সনদই জাল বা ভুয়া। এছাড়া ২২৯ জনের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ জাল হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে ৪৮ জনের বিএড, বিপিএড, গ্রন্থাগার বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদও ভুয়া বা জাল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি ও সরকারি এমপিও সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ থাকলেও এবার প্রথমবারের মতো সরকার বড় পরিসরে তালিকা তৈরি করে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের পথ আরও সুগম হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Leave a Reply