সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল আলোচিত নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। নতুন প্রস্তাবনায় নিচের দুই স্তরের সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বিপরীতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সুবিধা বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম রাখা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একইসঙ্গে সরকারি পেনশনভোগীদের জন্যও বড় ধরনের সুবিধা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে অনেকের পেনশন শতভাগ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সচিব কমিটির বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সকাল ১১টায় শুরু হওয়া বৈঠক দুপুর পর্যন্ত চলে। তবে বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি এবং নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় রেখে নতুন পে স্কেলের খসড়া পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ একবারে বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতো। তবে বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের দেওয়া ১০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতাকে নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করার পরিকল্পনা নেওয়ায় সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমেছে। এখন অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে বলে হিসাব করা হচ্ছে। এই আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে আগামী বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব প্রস্তুত করা হচ্ছে।
পে স্কেল সংক্রান্ত কমিটির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সবচেয়ে বেশি চাপে আছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীরা। ফলে নতুন বেতন কাঠামোতে তাদের জন্য বেতন বৃদ্ধির হার বেশি রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মচারী, অফিস সহায়ক, প্রশাসনিক স্টাফ, স্বাস্থ্যকর্মী ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের আর্থিক সুরক্ষা বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
এদিকে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সঙ্গে বুধবার (২০ মে) ও বৃহস্পতিবার (২১ মে) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে ধারাবাহিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকগুলোতেও নতুন জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন পে স্কেলের আওতায় শুধু প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নন, শিক্ষক, পুলিশ সদস্য, স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ প্রশাসন, বিচার বিভাগীয় কর্মচারীসহ সরকারি চাকরির প্রায় সব স্তরের কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
এর আগে সোমবার (১৮ মে) অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, আগামী অর্থবছরের শুরু অর্থাৎ ১ জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তিনি একইসঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণের অবস্থা এখনো দুর্বল। ফলে বাজেটে বিভিন্ন খাতে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। সেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছে।
জানা গেছে, কমিশনের মূল সুপারিশ সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন না করে সেটিকে কিছুটা সংশোধন ও কাটছাঁট করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি-এর নেতৃত্বাধীন কমিটি তিন অর্থবছরে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছিল বলে আলোচনা রয়েছে। তবে সরকারের বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে চূড়ান্ত বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে।
নতুন পে স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে পেনশন সুবিধা বৃদ্ধি। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, যেসব অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী বর্তমানে মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। যাদের মাসিক পেনশন ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে, তাদের ক্ষেত্রে প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। আর যাদের পেনশন ৪০ হাজার টাকার বেশি, তাদের জন্য প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রবীণ পেনশনভোগীদের জন্য চিকিৎসা ভাতাও বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনভোগীদের চিকিৎসা ভাতা বর্তমান ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ৫৫ বছরের কম বয়সী পেনশনভোগীদের জন্য চিকিৎসা ভাতা ৫ হাজার টাকা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নতুন প্রস্তাবে সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে প্রায় প্রতিটি গ্রেডেই বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন বর্তমানে ৮ হাজার ২৫০ টাকা থাকলেও সেটি বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার জোর সুপারিশ রয়েছে। অর্থাৎ নিম্ন স্তরের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে শতকরা হারে বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
প্রস্তাবিত নবম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী গ্রেডভিত্তিক সম্ভাব্য বেতন কাঠামো নিম্নরূপ—
| গ্রেড | প্রস্তাবিত বেতন স্কেল |
|---|---|
| ০১ | ১,৬০,০০০ টাকা (নির্ধারিত) |
| ০২ | ১,৩২,০০০ – ১,৫৩,০০০ টাকা |
| ০৩ | ১,১৩,০০০ – ১,৪৮,৮০০ টাকা |
| ০৪ | ১,০০,০০০ – ১,৪২,৪০০ টাকা |
| ০৫ | ৮৬,০০০ – ১,৩৯,৭০০ টাকা |
| ০৬ | ৭১,০০০ – ১,৩৪,০০০ টাকা |
| ০৭ | ৫৮,০০০ – ১,২৬,৮০০ টাকা |
| ০৮ | ৪৭,২০০ – ১,১৩,৭০০ টাকা |
| ০৯ | ৪৫,১০০ – ১,০৮,৮০০ টাকা |
| ১০ | ৩২,০০০ – ৭৭,৩০০ টাকা |
| ১১ | ২৫,০০০ – ৬০,৫০০ টাকা |
| ১২ | ২৪,৩০০ – ৫৮,৭০০ টাকা |
| ১৩ | ২৪,০০০ – ৫৮,০০০ টাকা |
| ১৪ | ২৩,৫০০ – ৫৬,৮০০ টাকা |
| ১৫ | ২২,৮০০ – ৫৫,২০০ টাকা |
| ১৬ | ২১,৯০০ – ৫২,৯০০ টাকা |
| ১৭ | ২১,৪০০ – ৫১,৯০০ টাকা |
| ১৮ | ২১,০০০ – ৫০,৯০০ টাকা |
| ১৯ | ২০,৫০০ – ৪৯,৬০০ টাকা |
| ২০ | ২০,০০০ – ৪৮,৪০০ টাকা |
তবে সংশ্লিষ্টরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এটি এখনো একটি প্রস্তাবিত খসড়া তালিকা। সরকারিভাবে প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো বেতন কাঠামোকেই চূড়ান্ত হিসেবে ধরা যাবে না। বর্তমানে সচিব কমিটি, অর্থ মন্ত্রণালয় ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ নিয়ে চূড়ান্ত সমন্বয় চলছে।
Leave a Reply