আগামী অর্থবছরের শুরুতেই, অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ লক্ষ্যে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে গঠিত কমিটি আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২১ মে) আবারও বৈঠকে বসছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ওই বৈঠক থেকেই পে-স্কেলের চূড়ান্ত রূপরেখা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই বরাদ্দ কার্যকর হলে আগামী ১ জুলাই থেকে দেশের সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ এবং বিভিন্ন বাহিনীতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন কাঠামোর আওতায় বর্ধিত বেতন পেতে শুরু করবেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত নবম পে-কমিশনের সুপারিশ হুবহু বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার গঠিত পর্যালোচনা কমিটি পে-কমিশনের মূল সুপারিশে বেশ কিছু সংশোধন ও কাটছাঁট এনে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে। সর্বশেষ প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী জুলাই মাস থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন নির্ধারিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন। পরবর্তী অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। আর ২০২৮-২০২৯ অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ভাতা ও অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা যুক্ত করা হবে।
পে-কমিশনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতো। কিন্তু বর্তমানে সরকারি চাকুরিজীবীরা যে ১০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা পাচ্ছেন, সেটিকে নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করার পরিকল্পনা নেওয়ায় সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কমে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এই আর্থিক হিসাব বিবেচনায় নিয়েই আসন্ন জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, সাবেক সচিব জাকির আহমেদ খান–এর নেতৃত্বে গঠিত পে-কমিশনের প্রতিবেদনে বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে সচিব কমিটি সেই প্রস্তাবগুলোর বড় অংশ সীমিত করার পক্ষে মত দিয়েছে। বিশেষ করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও আমলাদের জন্য মালি, বাবুর্চি, গাড়ি সুবিধা এবং অন্যান্য অতিরিক্ত ভাতা বড় আকারে বৃদ্ধির যে সুপারিশ ছিল, তা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কমে গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদ্যমান ভাতা কাঠামো বহাল রাখার দিকেই ঝুঁকছে সরকার।
জানা গেছে, জাকির আহমেদ খান কমিশন শুরুতে পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে হিসাব দিয়েছিল। পরে সংশোধিত প্রতিবেদনে বিভিন্ন ব্যয় কমিয়ে সেই পরিমাণ প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। এরপরও সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
সর্বশেষ সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি চাকুরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে নিম্নস্তরের কর্মচারীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশের বেশি এবং উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেতন প্রায় ১০৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধিরও সুপারিশ করা হয়েছে। বৈশাখী ভাতা বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে মাসিক টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। যেসব সরকারি কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে, তাদের জন্য বিশেষ মাসিক ভাতার প্রস্তাবও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
শুধু চাকুরিজীবীরাই নন, পেনশনভোগীরাও নতুন পে-স্কেলের আওতায় বড় ধরনের সুবিধা পেতে যাচ্ছেন। সংশোধিত প্রস্তাবে পেনশনভোগীদের পেনশন ৫৫ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকুরিজীবী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী আর্থিকভাবে উপকৃত হবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
যদিও নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না, তবুও সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হলেও নবম জাতীয় পে-স্কেল দেশের সরকারি বেতন কাঠামোয় একটি বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ধরে বেতন পুনর্নির্ধারণের দাবি বিবেচনায় এই উদ্যোগ সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
Leave a Reply