দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া বেতন নিয়ে ভোগান্তিতে থাকা এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য অবশেষে সুখবর এসেছে। বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা, ইএফটি (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) সংক্রান্ত সমস্যাসহ নানা কারণে যেসব শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত আটকে ছিল, তাদের বকেয়া অর্থ আগামী সপ্তাহে ব্যাংক হিসাবে জমা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে যেসব বেতন ইএফটি তথ্যের অসঙ্গতির কারণে “বাউন্স ব্যাক” হয়ে ফেরত গিয়েছিল, সেসব অর্থও পুনরায় প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি আটকে থাকা বেতন ফাইলগুলো নতুন করে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করা হয়েছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাব নম্বর, এনআইডি, জন্মতারিখ, মোবাইল ব্যাংকিং তথ্য কিংবা ইএফটি ডাটাবেইসের সঙ্গে অসামঞ্জস্য থাকায় বহু ক্ষেত্রে বেতন স্থানান্তর সম্পন্ন হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময়ে টাকা ব্যাংকে না গিয়ে ফেরত চলে আসে। এতে কয়েক মাস ধরে হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী আর্থিক সংকটে পড়েন।
বিশেষ করে নতুন এমপিওভুক্ত শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করা শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্তদের স্থলাভিষিক্ত নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী এবং যাদের ব্যাংক হিসাব হালনাগাদ হয়নি—তাদের মধ্যেই এ সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির তথ্য বিভিন্ন সার্ভারে ভিন্নভাবে সংরক্ষিত থাকায় ইএফটি সিস্টেম বেতন গ্রহণ করেনি। আবার কারও ব্যাংক হিসাব নিষ্ক্রিয় থাকায় বেতন ফেরত গেছে বলেও জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ফেরত যাওয়া অর্থ পুনরায় ছাড়ের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। যেসব শিক্ষক-কর্মচারীর তথ্য সংশোধন সম্পন্ন হয়েছে, তাদের বকেয়া অর্থ আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ব্যাংকে পাঠানো হতে পারে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে বেতন না পাওয়ায় শিক্ষক সমাজের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। অনেক শিক্ষক পরিবার চালাতে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছেন বলেও জানা গেছে। ঈদের আগে কিংবা নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বেতন না পাওয়ায় অনেকেই মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। ফলে বকেয়া বেতন ছাড়ের খবরে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
একজন ভুক্তভোগী শিক্ষক জানান, কয়েক মাস ধরে বেতন না পাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। বারবার অফিসে যোগাযোগ করেও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এখন যদি বকেয়া বেতন একসঙ্গে পাওয়া যায়, তাহলে অনেকটা চাপ কমে যাবে।
অন্যদিকে শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা শিক্ষক-কর্মচারীদের তথ্য সঠিকভাবে হালনাগাদ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে ব্যাংক হিসাব, এনআইডি তথ্য ও জন্মতারিখের ক্ষেত্রে সামান্য ভুল থাকলেও ইএফটি প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন। যাদের এখনও তথ্যগত সমস্যা রয়েছে, তাদের দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও উপজেলা/জেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষক নেতারাও আশা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের জটিলতা কমে আসে সে জন্য একটি স্থায়ী ও আধুনিক ডাটাবেইস ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে বেতন বাউন্স ব্যাক হলে দ্রুত সমাধানের জন্য আলাদা মনিটরিং সেল গঠনের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বকেয়া বেতন পাওয়ার সম্ভাবনায় এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। এখন সবাই তাকিয়ে আছেন আগামী সপ্তাহের দিকে, যখন বহু প্রতীক্ষিত সেই বেতন তাদের ব্যাংক হিসাবে জমা হবে।
Leave a Reply