বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অংশ পরিচালিত হয় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। দেশের প্রাথমিক স্তরের বাইরে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার বিশাল অংশই পরিচালনা করেন এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩৬ হাজারেরও বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে প্রায় ৬ লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত। দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো না কোনো পর্যায়ে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর শিক্ষকদের ইতিহাস মূলত আন্দোলন, বৈষম্য ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস।
পাকিস্তান আমলে বেসরকারি শিক্ষকদের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তখন শিক্ষকদের কোনো জাতীয় বেতন স্কেল ছিল না। সরকার মাসিক মাত্র ৫ টাকা “মহার্ঘ ভাতা” দিতেন। এই সামান্য অনুদান দিয়ে শিক্ষক সমাজের জীবনযাপন ছিল প্রায় অসম্ভব।
১৯৫৭-৫৮ সালের দিকে বাড়ি ভাড়া ও সম্মানজনক বেতনের দাবিতে ব্যাপক শিক্ষক আন্দোলন শুরু হয়। সে সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষকরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সংগঠিত কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলনের চাপে সরকার ধাপে ধাপে মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়। ফলে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ১৫ টাকা এবং কলেজ শিক্ষকরা ২০ টাকা পর্যন্ত সরকারি ভাতা পেতে শুরু করেন।
ষাটের দশকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও তা ছিল খুবই সীমিত। তখন কলেজ শিক্ষকেরা মাসিক ৩০ টাকা এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ২০ টাকা সরকারি অনুদান পেতেন। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের তুলনায় এই অর্থ ছিল অপ্রতুল। শিক্ষকতা তখনো একটি অবহেলিত পেশা হিসেবেই বিবেচিত হতো।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শিক্ষক সমাজ আশা করেছিল নতুন রাষ্ট্রে শিক্ষা ও শিক্ষকদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু স্বাধীনতার পরও বেসরকারি শিক্ষকদের ভাগ্যের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।
সরকারি অনুদান কিছুটা বাড়ানো হলেও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। কলেজ শিক্ষকেরা মাসিক ৫০ টাকা এবং স্কুল শিক্ষকেরা ৩০ টাকা সরকারি সহায়তা পেতেন। অধিকাংশ শিক্ষককে ব্যক্তিগত টিউশনি, কৃষিকাজ বা অন্য পেশার উপর নির্ভর করে সংসার চালাতে হতো।
১৯৭৭ সালে সামরিক সরকারের আমলে বেসরকারি শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধায় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনা হয়। এই সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষকদের সরকারি ভাতা প্রায় দ্বিগুণ করা হয়। কলেজ শিক্ষকেরা ২০০ টাকা এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ১১০ টাকা ভাতা পেতে শুরু করেন।
এটি ছিল বেসরকারি শিক্ষক সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কারণ প্রথমবারের মতো সরকার উপলব্ধি করতে শুরু করে যে শিক্ষা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে শিক্ষক সমাজকে ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা দিতে হবে।
১৯৮০ সালে বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি নেওয়া হয়। প্রথমবারের মতো বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একইসাথে তাদের বেতনের ৫০ শতাংশ সরকারি তহবিল থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়।
এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন। কারণ এর আগে শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠানের দয়া-দাক্ষিণ্যের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্তির ফলে শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা বাড়ে এবং চাকরির একটি কাঠামোগত নিরাপত্তা তৈরি হয়।
১৯৮২ সালে ১৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা চালু করা হয়। শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে ১৯৮৩ সালে এটি বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়।
১৯৮৪ সালে চালু হয় এমপিও (Monthly Pay Order) ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে শিক্ষকদের সরকারি অংশ সরাসরি সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে প্রদান শুরু হয়। এই পদক্ষেপের ফলে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বা কলেজ গভর্নিং বডির একচ্ছত্র আধিপত্য অনেকাংশে কমে যায়। আগে অনেক শিক্ষক মাসের পর মাস বেতন পেতেন না কিংবা নানা অনিয়মের শিকার হতেন। এমপিও ব্যবস্থার ফলে চাকরির নিরাপত্তা কিছুটা বৃদ্ধি পায়।
১৯৮৬ সালে মেডিকেল ভাতা ৬০ টাকা থেকে ১০০ টাকায় উন্নীত করা হয়। একইসাথে সরকারি বেতনের অংশ ২০ শতাংশ বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করা হয়। এছাড়া শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণে “শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট” গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
নব্বইয়ের দশক ছিল বেসরকারি শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের সবচেয়ে তীব্র আন্দোলনের সময়। এ সময় শিক্ষক সংগঠনগুলো শতভাগ বেতন, টাইম স্কেল, বাড়ি ভাড়া ও চাকরির নিরাপত্তার দাবিতে রাজপথে নামে।
১৯৯৪ সালে “শতভাগ বেতন” দাবিতে দেশব্যাপী শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনে পাবলিক পরীক্ষা বর্জন, ধর্মঘট, মানববন্ধন ও হরতালের মতো কঠোর কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আন্দোলনের ফলস্বরূপ সরকার মেডিকেল ভাতা ১৫০ টাকায় উন্নীত করে এবং শিক্ষকদের টাইম স্কেল সুবিধা প্রদান শুরু করে।
১৯৯৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার সরকারি বেতনের অংশ আরও ১০ শতাংশ বাড়িয়ে ৮০ শতাংশে উন্নীত করে। এটি শিক্ষক সমাজের জন্য আরেকটি বড় অর্জন ছিল।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বেসরকারি শিক্ষকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা চালু হয়।
একইসাথে শিক্ষকদের বেতনের সরকারি অংশ সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর ব্যবস্থা চালু করা হয়। এতে অনিয়ম কমে এবং শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
তবে এই সময় শিক্ষক সংগঠনগুলো নানা রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজনে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে আন্দোলনের ঐক্য দুর্বল হতে থাকে।
২০০০ সালে গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে সরকারি বেতনের অংশ ৯০ শতাংশে উন্নীত করা হয়।
২০০২ সালে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য দুটি ঐতিহাসিক সুবিধা চালু হয়—
তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে শিক্ষকদের জন্য বেসিকের ২৫ শতাংশ এবং কর্মচারীদের জন্য ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা চালু করা হয়।
পরবর্তীতে দীর্ঘ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ২০০৬ সালে সরকারি বেতনের অংশ ১০০ শতাংশ করা হয়। এটি ছিল এমপিওভুক্ত শিক্ষক সমাজের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। কারণ এর মাধ্যমে সরকার কার্যত শিক্ষকদের পূর্ণ বেতনের দায়িত্ব গ্রহণ করে।
২০১২-১৩ সালে বাড়ি ভাড়া ও মেডিকেল ভাতা ৩০০ টাকায় উন্নীত করা হয়।
২০১৫ সালে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা অষ্টম জাতীয় পে-স্কেলের অন্তর্ভুক্ত হন। এতে তাদের মূল বেতন বৃদ্ধি পায়।
২০১৬ সালে বাড়ি ভাড়া ১ হাজার টাকা এবং মেডিকেল ভাতা ৫০০ টাকায় উন্নীত করা হয়। একইসাথে ইএফটি (Electronic Fund Transfer) পদ্ধতি চালু হয়। ফলে শিক্ষকদের বেতন সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হতে শুরু করে।
দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি শিক্ষকরা সরকারি শিক্ষকদের মতো বেসিকের শতকরা হারে বাড়ি ভাড়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কারণ নির্ধারিত ১ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া বর্তমান বাজার বাস্তবতায় অত্যন্ত অপ্রতুল হয়ে পড়ে।
২০২৫ সালে শিক্ষক আন্দোলনের মুখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—
এটি দীর্ঘদিনের একটি দাবির আংশিক বাস্তবায়ন হিসেবে বিবেচিত হয়।
বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী শতভাগ বেতন পান। তারা—
পেয়ে থাকেন।
কিন্তু সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় এখনো বিশাল বৈষম্য রয়ে গেছে। সরকারি শিক্ষকেরা যেখানে—
পেয়ে থাকেন, সেখানে বেসরকারি শিক্ষকেরা এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
বেসরকারি শিক্ষক সমাজের সবচেয়ে বড় দাবি হলো শিক্ষা ব্যবস্থার পূর্ণ জাতীয়করণ। কারণ একই কারিকুলাম, একই সিলেবাস ও একই পরীক্ষার অধীনে পাঠদান করেও সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার বিশাল বৈষম্য বিদ্যমান।
একজন বেসরকারি শিক্ষক অবসরের পর আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েন। চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানের শিক্ষা ও বাসস্থান ব্যয় বহন করতে গিয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করেন।
শিক্ষকদের ভাষায়—
“সম্মান ধুয়ে পানি খাওয়া যায় না। বেঁচে থাকার মতো বেতন-ভাতা নিশ্চিত না হলে শিক্ষক সমাজ কখনো মর্যাদার জীবন পাবে না।”
বাংলাদেশের বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক সমাজের ইতিহাস মূলত অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। পাকিস্তান আমলের ৫ টাকা মহার্ঘ ভাতা থেকে শুরু করে আজকের শতভাগ বেতন—এই দীর্ঘ পথচলার প্রতিটি অর্জনের পেছনে রয়েছে শিক্ষক সমাজের আন্দোলন, ত্যাগ ও ঐক্য।
তবুও বৈষম্যের অবসান এখনো হয়নি। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আর শিক্ষক সেই জাতির নির্মাতা। শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়।
আজ প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের বৈষম্য দূর করা, মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করা। কারণ শিক্ষক যদি সম্মান নিয়ে বাঁচতে না পারেন, তবে জাতির ভবিষ্যৎও নিরাপদ হতে পারে না।
Leave a Reply