বাস্তবায়নের পথে থাকা নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকার ইতোমধ্যেই একটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য প্রাথমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে কার্যকর করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় বেতন কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারী, স্বল্প আয়ের পেনশনভোগী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের অভিভাবকদের। মূলত বর্তমান উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় এনে এই শ্রেণিগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এই বিশাল বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সংশ্লেষ জড়িত থাকায় প্রথম ধাপেই সবার জন্য পূর্ণাঙ্গ সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন বাজেটে বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে অতিরিক্ত প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই বরাদ্দের মাধ্যমে প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতনের প্রায় অর্ধেক বাস্তবায়ন করার চিন্তা রয়েছে। বিশেষ করে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এই অর্থের বড় অংশ ব্যয় হবে, যাতে তারা বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে পারেন। জাতীয় বেতন কমিশন সর্বনিম্ন ধাপের বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করার যে সুপারিশ করেছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রথম ধাপেই কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা শুরুতেই কিছুটা আর্থিক স্বস্তি অনুভব করতে পারবেন।
নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাবে পেনশনভোগীদের জন্য যে বিন্যাস রাখা হয়েছে, তা বিশেষভাবে মানবিক বিবেচনায় তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে যারা মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাদের জন্য সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থ বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেলের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের সময় এই ক্ষুদ্র পেনশনভোগীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুবিধা দেওয়া হবে। অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে বেশি অংকের পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য বৃদ্ধির হার ৫৫ থেকে ৭৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখা হয়েছে, যাতে সামগ্রিক বাজেটের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন নিশ্চিত করা যায়।
এছাড়া ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য টিফিন ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টিও এই প্রস্তাবনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে যেখানে টিফিন ভাতা ২০০ টাকা, তা বাড়িয়ে এক হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে এবং এটি প্রথম ধাপেই কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। একইসঙ্গে সকল পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীদের জন্য বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাবও অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে কর্মচারীদের অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে।
সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে যাদের প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে, তাদের জন্য মাসিক দুই হাজার টাকা ভাতা প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থ বিভাগ এই প্রস্তাবটিকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে এবং এটি প্রথম ধাপেই কার্যকর করার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাকরিজীবী পরিবারের একটি বিশেষ অংশ সরাসরি উপকৃত হবে এবং তাদের আর্থিক চাপ কিছুটা লাঘব পাবে।
অন্যদিকে, শুধুমাত্র নিম্নস্তরের কর্মচারীদের জন্যই নয়, সরকারি চাকরিতে মেধাবী জনবল ধরে রাখার লক্ষ্যেও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পুনর্বিন্যাস করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে উচ্চপদের বড় অংকের বেতন বৃদ্ধি ও অন্যান্য সুবিধাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এসব সুবিধা পর্যায়ক্রমে পরবর্তী দুই অর্থবছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হতে পারে, যাতে সামগ্রিক আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয়।
Leave a Reply