সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে নতুন অগ্রগতি দেখা দিয়েছে। তিনটি পৃথক বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনার লক্ষ্যে পুনর্গঠিত কমিটি ধাপে ধাপে এই পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এটি আগামী পহেলা জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ২১ এপ্রিল সরকার জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিশন–সংক্রান্ত সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটিকে পুনর্গঠন করে। পুনর্গঠনের পর কমিটি তাদের মতামত ও সুপারিশ চূড়ান্ত করে জমা দিয়েছে। এসব সুপারিশের আলোকে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে একটি বিশেষ বরাদ্দ রাখার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, বর্তমান দ্রব্যমূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বিদ্যমান মুদ্রাস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে কমিটি তাদের সুপারিশ তৈরি করেছে। এতে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে গিয়ে এককালীন বাস্তবায়নের পরিবর্তে কয়েকটি ধাপে ৯ম পে-স্কেল কার্যকর করা হলে তা অধিক বাস্তবসম্মত হবে। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি আগামী জুলাই থেকেই কার্যকর হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন, তিনি জানান যে সচিব কমিটির সুপারিশ বর্তমানে পর্যবেক্ষণাধীন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আসন্ন বাজেটে এ উদ্দেশ্যে বিশেষ বরাদ্দ অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। প্রথম ধাপে মূল বেতন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে এবং পরবর্তী ধাপগুলোতে চিকিৎসা ভাতা, বাসাভাড়া ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করা হবে। তবে এসব বাস্তবায়নের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০১৫ সালে ৮ম পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল। এর পর দীর্ঘ ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও ৯ম পে-স্কেল কার্যকর করা হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে পে-স্কেলের সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে পে-কমিশন গঠন করে। পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বেই পে-কমিশন তাদের সুপারিশ জমা দেয়।
নতুন সুপারিশ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১,৬০,০০০ টাকা। এতে বেতন অনুপাত দাঁড়াচ্ছে ১:৮। উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৭৩ সালের প্রথম বেতন কমিশনে এই অনুপাত ছিল ১:১৫.৪, আর ২০১৫ সালের সর্বশেষ বেতন কমিশনে তা কমে দাঁড়ায় ১:৯.৪। সে তুলনায় বর্তমান জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫ সালে ইতিহাসের সর্বনিম্ন অনুপাত ১:৮ নির্ধারণের সুপারিশ করেছে।
প্রস্তাবিত পে-স্কেলের একটি উদাহরণে দেখা যায়, বর্তমানে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কর্মরত ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা, যা বিভিন্ন ভাতা যুক্ত হয়ে মোট ১৬,৯৫০ টাকায় দাঁড়ায়। কিন্তু নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, তার মূল বেতন ২০,০০০ টাকায় উন্নীত হবে এবং বিভিন্ন ভাতা যুক্ত হয়ে মোট বেতন-ভাতা ৪১,৯০৮ টাকায় পৌঁছাবে।
একইভাবে ১৯তম গ্রেড থেকে শুরু করে ১ম গ্রেড পর্যন্ত সকল স্তরের বেতন ও ভাতা বৃদ্ধি পাবে। তবে সমতা ও যুক্তিসঙ্গততার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে উচ্চ গ্রেডগুলোর ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে কম রাখা হয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট ভাতা—যেমন যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা, ধোলাই ভাতা ও ঝুঁকি ভাতা—১০ম বা ১১তম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীরা পেয়ে থাকেন, যা প্রযোজ্যতার ভিত্তিতে বহাল থাকবে।
এছাড়া ভাতা বৃদ্ধির হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে গাড়ি সুবিধা নগদায়ন (যা ৫ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য প্রযোজ্য) অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে ১ম থেকে ৯ম গ্রেড পর্যন্ত ভাতা বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে কম দেখা যেতে পারে। প্রস্তাবনায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, নতুন বেতনস্কেল কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে বর্তমানে প্রদত্ত ১০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ বিশেষ ভাতা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সমন্বয় করা যেতে পারে।
Leave a Reply