সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পুনর্গঠিত তিনটি বেতন কমিশন–সংক্রান্ত সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি ধাপে ধাপে এ পে-স্কেল কার্যকর করার প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথম ধাপেই সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি অগ্রাধিকার পেতে পারে।
গত ২১ এপ্রিল সরকার জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিশন–সংক্রান্ত সুপারিশ প্রণয়ন কমিটিকে পুনর্গঠন করে। সম্প্রতি পুনর্গঠিত এই কমিটি তাদের মতামত ও সুপারিশ সরকারকে অবহিত করেছে। কমিটির এই মতামতের ভিত্তিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আসন্ন বাজেটে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, বর্তমান দ্রব্যমূল্য, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং বিদ্যমান মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্যে গঠিত কমিটি তাদের সুপারিশ জমা দিয়েছে। এই সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাষ্ট্রের ওপর আর্থিক চাপ কমিয়ে আনতে নবম পে-স্কেল একযোগে না করে কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়ন করাই হবে বাস্তবসম্মত।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন, জানান—সচিব পর্যায়ের কমিটির সুপারিশ বর্তমানে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আসন্ন বাজেটে এ খাতে বিশেষ বরাদ্দ রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে, তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিগত অনুমোদন পাওয়া গেলে ধাপে ধাপে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রথম ধাপে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিকভাবে মূল বেতন বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী ধাপগুলোতে চিকিৎসা ভাতা, বাড়িভাড়া ভাতা এবং অন্যান্য ভাতা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। তবে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর প্রায় ১১ বছর অতিবাহিত হলেও নবম পে-স্কেল কার্যকর হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার নবম পে-স্কেল প্রণয়নের জন্য একটি পে-কমিশন গঠন করে। পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বেই এই পে-কমিশন তাদের সুপারিশ জমা দেয়।
সুপারিশ অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোতে সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১,৬০,০০০ টাকা, যেখানে বেতন অনুপাত ধরা হয়েছে ১:৮। উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালের প্রথম বেতন কমিশনে এই অনুপাত ছিল ১:১৫.৪, আর ২০১৫ সালের অষ্টম পে-স্কেলে তা কমে দাঁড়ায় ১:৯.৪। সে তুলনায় ২০২৫ সালের জাতীয় বেতন কমিশন সর্বনিম্ন ১:৮ অনুপাত প্রস্তাব করেছে, যা এ পর্যন্ত সর্বনিম্ন।
প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, বর্তমানে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কর্মরত ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা। বিভিন্ন ভাতা—যেমন বাড়িভাড়া ও অন্যান্য সুবিধা—যুক্ত হয়ে তার মোট বেতন-ভাতা দাঁড়ায় ১৬,৯৫০ টাকা। তবে প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেল অনুযায়ী, একই কর্মচারীর মূল বেতন হবে ২০,০০০ টাকা এবং ভাতাসহ মোট বেতন-ভাতা বেড়ে দাঁড়াবে ৪১,৯০৮ টাকা।
একইভাবে ১৯তম গ্রেড থেকে শুরু করে ১ম গ্রেড পর্যন্ত সব স্তরের কর্মচারীদের ভাতা বৃদ্ধি পাবে, তবে এই বৃদ্ধির হার হবে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত। কারণ, যুক্তিসঙ্গত ভারসাম্য ও সমতা বজায় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট ভাতা—যেমন যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা, ধোলাই ভাতা এবং ঝুঁকিভাতা—মূলত ১০ম বা ১১তম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীরা পেয়ে থাকেন, এবং এসব ভাতাও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সমন্বয় করা হবে।
এছাড়া ভাতা বৃদ্ধির হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৫ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের গাড়ি সুবিধা নগদায়নের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এর ফলে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের ভাতা বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে কম প্রতীয়মান হতে পারে।
সুপারিশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রস্তাবিত নতুন বেতনস্কেল কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে বর্তমানে প্রচলিত ১০ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ বিশেষ ভাতা বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী সমন্বয় করা যেতে পারে।
Leave a Reply