ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়ে গেলেও সংবিধান সংস্কার প্রশ্নটি এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংস্কার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নেতারা মনে করছেন, শুধু সংসদের ভেতরেই নয়, সংসদের বাইরেও চাপ তৈরি করা জরুরি, আর সে কারণেই তারা রাজপথের রাজনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের নির্ধারিত সময়সীমা ছিল গত ১৫ মার্চ পর্যন্ত। তবে সরকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হলে আগে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর সংসদ সদস্যরা সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ করলেও বিএনপির সংসদ সদস্যরা এতে অংশ নেননি। ফলে বিরোধী জোটের নেতাদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি হয়তো উপেক্ষিত থেকে যেতে পারে।
এদিকে, টানা ১৩ দিনের বিরতির পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আবার বসতে যাচ্ছে। আগামীকাল রোববার (২৯ মার্চ) বিকেল ৩টায় এই অধিবেশন শুরু হবে। এর ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসছে।
গত ২৬ মার্চ জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে উপেক্ষা করার চেষ্টা চলছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি সংসদের ভেতরে সংস্কার বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে এই দাবি রাজপথে গড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবেই এর নিষ্পত্তি হবে।
এর আগে ২১ মার্চ ঈদের নামাজ শেষে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়ে একটি প্রতিশ্রুতি ছিল এবং সেটি বাস্তবায়নের জন্য তারা সংসদের ভেতরে ও বাইরে সর্বাত্মক চাপ সৃষ্টি করবেন। তিনি আরও বলেন, তারা কোনো উত্তপ্ত পরিস্থিতি চান না; বরং সকল রাজনৈতিক পক্ষের অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং একইভাবে সবকিছু বাস্তবায়ন করতে চান। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকারের ভূমিকার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সংস্কার কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে গত ২ মার্চ এনসিপি ‘সংস্কার বাস্তবায়ন বিষয়ক কমিটি’ গঠন করে। এই কমিটির প্রধান করা হয় সদস্য সচিব আখতার হোসেনকে এবং উপপ্রধান করা হয় যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারকে।
দলটির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, সংসদ অধিবেশন শুরুর আগে আজ শনিবার (২৮ মার্চ) এই কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে এনসিপি সংসদের ভেতরে তাদের সংসদ সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকার পাশাপাশি রাজপথেও শক্ত অবস্থান বজায় রাখতে চায়। এ লক্ষ্য সামনে রেখে দলটি নিজেদের কর্মসূচির পাশাপাশি নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে জনমত গঠনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
এ প্রসঙ্গে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার অভিযোগ করে বলেন, সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন কমিশনের কাজেও তারা এর প্রতিফলন দেখেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে মৌখিক আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তারা সংস্কার বাস্তবায়ন করতে আগ্রহী নয়, কারণ রাষ্ট্র সংস্কার হলে নির্বাহী ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই সরকার পিছিয়ে রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে, সংবিধান সংস্কার সভা গঠনের দাবিতে আগামীকাল রোববার (২৯ মার্চ) দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। ‘গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরাম’-এর ব্যানারে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হচ্ছে। ‘গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক কমিটি’-এর আহ্বানে অনুষ্ঠিত এই মানববন্ধনে জুলাই সনদের পক্ষে অবস্থান নেওয়া বিভিন্ন নাগরিক ও সামাজিক সংগঠন অংশগ্রহণ করবে বলে জানা গেছে। এছাড়া এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারও দলের পক্ষ থেকে এই কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকবেন।
Leave a Reply