২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব গ্রহণ করা অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতেই যেসব বড় উদ্যোগ নেয়, তার মধ্যে অন্যতম ছিল নতুন পে-স্কেল প্রণয়নের উদ্যোগ। তবে পরবর্তীতে নতুন সরকার গঠনের পর এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণা না আসায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে যখন জানা যায়, পে-স্কেলের জন্য বরাদ্দকৃত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার একটি বড় অংশ অন্য খাতে ব্যয় করা হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ বেড়েছে। একই সময়ে ইরানকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক উত্তেজনা অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। তবে এসব উদ্বেগের মাঝেও সরকারি চাকরিজীবীদের প্রধান ভরসা এখন আসন্ন জাতীয় বাজেট।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্যমতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট আগামী ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। তারেক রহমান-এর নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এটি হবে প্রথম বাজেট। প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার বিশাল এ বাজেটে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। কিন্তু এই বাজেটে পে-স্কেলের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, তা নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এখনো সংশয় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিভিন্ন কারণে প্রশাসনের ভেতরে চাপা অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে পে-স্কেল বাস্তবায়ন বিলম্বিত হলে সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দফতরে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার আশঙ্কা রয়েছে। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির চাপ, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা মোকাবিলায় সরকারকে বাড়তি চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় নতুন করে আন্দোলন শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার এখন ধীরগতিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা, রাজস্ব ঘাটতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে বড় কোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সরকার। তবে সরকারি কর্মচারীরা দ্রুত পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, এটি তাদের ন্যায্য অধিকার। দীর্ঘদিন ধরে নতুন পে-স্কেল না হওয়া এবং সুপারিশ বাস্তবায়নে বিলম্ব তাদের অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলছে।
এর মধ্যে বরাদ্দকৃত ৪০ হাজার কোটি টাকার বড় অংশ ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি ও জ্বালানি তেলের ভর্তুকিতে ব্যয় হয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের অর্থ সংকট বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এই অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পে-স্কেল ইস্যুতে নেতিবাচক প্রভাব কমাতে সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) ঘোষণা দিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন বেতন কাঠামো একসঙ্গে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে কার্যকর করা হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলেও তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বরাদ্দ দেওয়া অর্থ বর্তমান সরকার অন্য খাতে ব্যয় করতেই পারে। তবে আগামী বাজেটে পে-স্কেলের জন্য নতুন করে বরাদ্দ রাখা জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে না হলেও অন্তত জুলাই মাস থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকর করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি কর্মচারীরাও রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা ভালো না থাকলে সেবার মানও ব্যাহত হবে। সংসার চালাতে হিমশিম খেলে তারা বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে বাধ্য হয়, যা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য ভালো নয়। তাই দ্রুত পে-স্কেল বাস্তবায়ন করে তাদের আর্থিক সংকট দূর করা সরকারের দায়িত্ব।
অন্যদিকে, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, পে-স্কেলের সুপারিশ না দেখে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এই খাতে মোট কত অর্থ প্রয়োজন হবে, সেটি আগে নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি দেশের বর্তমান ট্যাক্স রেভিনিউ এবং ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হতে পারে।
এছাড়া জানা গেছে, সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন পিকেএসএফ ও পে কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান। যদিও বৈঠকটি মূলত পিকেএসএফ সংক্রান্ত ছিল, তবুও পে কমিশনের বিষয়েও সেখানে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থ প্রয়োজন হতে পারে। এই বিশাল ব্যয়ের চাপ এবং বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট বিবেচনায় সরকার এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে সরকারি কর্মচারীদের পক্ষ থেকে স্মারকলিপি প্রদান, অবস্থান কর্মসূচি ইত্যাদির মাধ্যমে দাবি জানানো অব্যাহত থাকবে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বড় ধরনের আন্দোলন এখনই না হলেও, বাজেট ঘোষণার দিকে সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।
Leave a Reply