মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র ও ভয়াবহ সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে ১৫ দফার একটি বিস্তৃত ও বিস্তারিত প্রস্তাব পাঠিয়েছে। অপরদিকে, যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য চুক্তিতে পৌঁছাতে তেহরানও পাল্টা ৫টি কঠোর ও স্পষ্ট শর্ত যুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম যেমন The New York Times, The Wall Street Journal, CNN এবং The Washington Post-এর প্রতিবেদন থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগের তথ্য সামনে এসেছে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে এই প্রস্তাব তেহরানে পাঠানো হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কঠোরভাবে সীমিত করা এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের ভূমিকাকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করা। এই জটিল মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান Syed Asim Munir গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। পাশাপাশি Pakistan, Turkey এবং Egypt সরাসরি আলোচনার আয়োজন করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা পরিস্থিতি সমাধানে একটি সম্ভাব্য ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ইরানকে তাদের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা—Natanz Nuclear Facility, Isfahan Nuclear Technology Center এবং Fordow Fuel Enrichment Plant—সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে যেকোনো ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করা, ইতোমধ্যে সমৃদ্ধ করা উপাদান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা এবং সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাকে পূর্ণাঙ্গ ও বাধাহীন প্রবেশাধিকার দেওয়ার শর্তও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এছাড়া প্রস্তাবনায় এক মাসের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি প্রদান, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি স্থগিত রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন বন্ধ করার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ Strait of Hormuz-কে একটি উন্মুক্ত ও নিরাপদ আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে রাখার শর্তও এতে সংযোজন করা হয়েছে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত সব পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং Bushehr Nuclear Power Plant-কে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বেসামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ বন্ধের জন্য ৫টি কঠোর শর্ত দিয়েছে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে—প্রথমত, যুদ্ধ আর কখনো পুনরায় শুরু হবে না—এমন শক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। দ্বিতীয়ত, Strait of Hormuz-এর নিয়ন্ত্রণ কার্যত ইরানের হাতে রাখতে হবে। তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করতে হবে। চতুর্থত, চলমান যুদ্ধে যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার জন্য ইরানকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এবং পঞ্চমত, ইরানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো সংবাদকর্মী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হস্তান্তর কিংবা তাদের বিরুদ্ধে বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে তাদের আলোচনা ‘খুব ভালো ও ফলপ্রসূ’ হয়েছে এবং উভয় পক্ষই একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। পরিস্থিতি শান্ত করার অংশ হিসেবে তিনি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর সম্ভাব্য হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণাও দিয়েছেন। যদিও শুরুতে ইরান এই আলোচনা অস্বীকার করেছিল, পরে ইরানি সূত্র CNN-কে জানায় যে, তারা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি ‘টেকসই’ ও কার্যকর প্রস্তাব শুনতে আগ্রহী এবং দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাত ইতোমধ্যে চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। যদিও কূটনৈতিক তৎপরতা ক্রমেই বাড়ছে, তবুও দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে এখনো উল্লেখযোগ্য দূরত্ব রয়ে গেছে। ফলে সমাধানের পথ এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয় এবং অঞ্চলজুড়ে হামলা ও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
Leave a Reply