সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাশিত নতুন জাতীয় বেতন কমিশন বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরে কমিশন কার্যকর করার উদ্দেশ্যে বাজেটে যে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষণ করা হয়েছিল, তার প্রায় পুরো অংশই ইতোমধ্যে অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। মূলত জ্বালানি খাতে বাড়তি ভর্তুকি এবং নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য এই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। ফলে বর্তমান অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে ধারণা করা হচ্ছে।
শনিবার (১৪ মার্চ) প্রকাশিত ‘জাতীয় অর্থনীতি’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা কাঠামো সংস্কারের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে বিভিন্ন জরুরি খাতে ব্যয়ের প্রয়োজন দেখা দেওয়ায় সেই অর্থের বড় অংশ অন্য খাতে স্থানান্তর করা হয়।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোট সংরক্ষিত ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৯ হাজার ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে বেতন কমিশন বাস্তবায়নের জন্য সংরক্ষিত তহবিলে এখন অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৯৬১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যা এত বড় একটি কমিশন বাস্তবায়নের জন্য একেবারেই অপ্রতুল।
কর্মকর্তারা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন জাতীয় বেতন কমিশন বাস্তবায়নের প্রস্তুতি হিসেবে বাজেটে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করা হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন সরকারের ব্যয় পরিকল্পনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইরানের পাল্টা হামলা এবং সামরিক উত্তেজনার জেরে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ কার্যত বাধাগ্রস্ত হয়। এতে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে এবং জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা দেখা দেয়।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়। বাংলাদেশ সরকারকেও তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে সরকারের বাজেট ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করতে হয়েছে এবং জ্বালানি খাতে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ভর্তুকি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বেতন-ভাতা খাতের সংরক্ষিত অর্থ থেকে জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় মেটাতে চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত ২৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কৃষিঋণ মওকুফের জন্য ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকার মনে করছে, কৃষকদের আর্থিক চাপ কমানো এবং কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র পরিবারের আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সরকারের উদ্যোগে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নামে একটি নতুন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের একজন নারী সদস্যকে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। এই কর্মসূচিটি প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে শুরু করা হয়েছে এবং এর জন্য বাজেট থেকে ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এইসব খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার ফলে বেতন কমিশনের জন্য সংরক্ষিত তহবিল প্রায় পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। হিসাব অনুযায়ী, মোট ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩৯ হাজার ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়েছে। ফলে অবশিষ্ট অর্থ এতটাই কম যে তা দিয়ে নতুন জাতীয় বেতন কমিশনের মতো বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বেতন কমিশন বাস্তবায়নের মতো বড় আর্থিক উদ্যোগ নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। কারণ বেতন কাঠামো পরিবর্তন করতে গেলে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে, যা বর্তমান বাজেট কাঠামোর মধ্যে জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে যে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের মতো অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন নেই। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ সরকারের আর্থিক পরিকল্পনাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। এই কারণে আপাতত নতুন বেতন কমিশন বাস্তবায়নের সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। তিনি আরও বলেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যেও এই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ বাজেটের বড় অংশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন জরুরি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়ে গেছে।
এদিকে বেতন বৃদ্ধির জন্য সংরক্ষিত অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। তাদের অনেকেই মনে করছেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কঠিন হলেও সরকার চাইলে অন্তত আংশিকভাবে হলেও কিছু পদক্ষেপ নিতে পারত।
একাধিক সরকারি কর্মচারী জানিয়েছেন, তারা বুঝতে পারছেন যে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। তবুও তারা আশা করছেন, সরকার যদি পুরো বেতন কমিশন বাস্তবায়ন করতে না-ও পারে, তাহলে অন্তত আংশিক কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে। বিশেষ করে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সামান্য বেতন বৃদ্ধি হলেও তা সরকারি কর্মচারীদের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
একজন কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে তারা শুনেছেন যে আপাতত বেতন কমিশন বাস্তবায়ন করা হবে না। তবে সরকার চাইলে আংশিকভাবে কিছু সুবিধা বা বেতন সমন্বয় করতে পারে। বিশেষ করে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে সামান্য বেতন বৃদ্ধি হলেও তা সরকারি কর্মচারীদের জন্য অনেকটাই সহায়ক হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
Leave a Reply