প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো নিজ কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন তারেক রহমান। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত এই সভা ছিল নতুন সরকারের প্রশাসনিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। এই মতবিনিময় কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়—বরং সরকারের লক্ষ্য, অগ্রাধিকার ও কর্মপদ্ধতির একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সভায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ ব্যাপক প্রত্যাশা নিয়ে সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, সরকার কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিচালিত হয় না; বরং প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও সরকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া সরকারের কোনো অঙ্গীকার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তার বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল—সরকারের সাফল্য নির্ভর করছে প্রশাসনের দক্ষতা, সততা ও দায়বদ্ধতার ওপর।
তিনি আরও বলেন, “আমরা এই দেশকে আমাদের প্রথম ও শেষ ঠিকানা বলে মনে করি।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের প্রশ্নটিকে সামনে আনেন। জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি প্রশাসনিক কর্মতৎপরতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর নির্বাচনি ম্যানিফেস্টো বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দিয়েছে। ফলে মেনিফেস্টোতে ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা সরকারের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উন্নয়ন, নারী শিক্ষা বিস্তার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্রীড়া উন্নয়নসহ ঘোষিত প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তিনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।
নিরাপত্তা ও সুশাসনের প্রসঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দেশের মানুষকে নিরাপদ অনুভব করাতে হবে—শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মাধ্যমে নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসনিক পরিবেশ নিশ্চিত করে। একইসঙ্গে দুর্নীতি দমনে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকার ওপর জোর দেন তিনি। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তুলতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পূর্ণ সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।
সভায় গোপনীয়তা রক্ষা ও সরকারি নিয়ম-নীতি কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সরকারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যথাযথভাবে গোপন রাখা এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে বিধিবিধান মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সুশৃঙ্খল ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় প্রশাসনের পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতার বিকল্প নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, হুমায়ুন কবির, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামসুল ইসলাম, ডা. জাহেদ উর রহমান ও মাহ্দী আমিন উপস্থিত ছিলেন। সভায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার স্বাগত বক্তব্য রাখেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী কার্যালয়ের গঠন ও কার্যাবলি বিষয়ে একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনস্থ দপ্তর ও সংস্থার প্রধানগণ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও সভায় অংশ নেন।
এই মতবিনিময় সভা নতুন সরকারের প্রশাসনিক দর্শনের একটি প্রতিফলন। রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য—এই বার্তাই দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে সরকার ও প্রশাসন কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কতটা সফল হয়।
Leave a Reply