সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণ করে ঈদের আগেই ৯ম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারি দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ। আজ রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বরাবর সংগঠনটির নেতারা এ স্মারকলিপি প্রদান করেন।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, বৈষম্যহীন ৯ম পে-স্কেল ১৪ অনুপাতে ১২টি গ্রেড নির্ধারণ করে সর্বনিম্ন বেতন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে এবং পবিত্র ঈদুল ফিতর-এর পূর্বেই ৯ম পে-স্কেলের গেজেট জারি করতে হবে। এতে সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য নিরসন হবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলে উল্লেখ করা হয়।
স্মারকলিপিতে সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানো হয়। বলা হয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করায় দেশের জনগণ যেমন ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে, তেমনি গণতন্ত্রও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারি দাবি আদায় ঐক্য পরিষদকে দেশের কর্মচারী অঙ্গনের সর্ববৃহৎ পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, এটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সকল দপ্তর ও প্রতিষ্ঠান, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের দপ্তরভিত্তিক ও জাতীয়ভিত্তিক সংগঠনসমূহের সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট।
স্মারকলিপিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ সালে ৮ম পে-স্কেলে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীদের বৈষম্যের বেড়াজালে আবদ্ধ করা হয়। এরপর প্রথম পর্যায়ে পে-স্কেলের বৈষম্য নিরসনের লক্ষ্যে আবেদন-নিবেদন ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হলেও তৎকালীন সরকারের কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি বিগত কোনো সরকারই সংগঠনটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসেনি। অথচ অতীতে বিএনপি সরকার ১৯৯১ ও ২০০৫ সালে কর্মচারীদের দুর্দশা বিবেচনায় দুটি পৃথক পে-স্কেল ঘোষণা করেছিল।
গত ১১ বছর ধরে কর্মচারীরা নতুন পে-স্কেল থেকে বঞ্চিত রয়েছেন বলে দাবি করা হয়। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ছয় সদস্যের একটি পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করতেই কর্মচারীরা হিমশিম খাচ্ছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘যথাসময়ে ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে’—এই অঙ্গীকার ছিল বলেও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, যা কর্মচারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০১৯ সাল থেকে বৈষম্যহীন ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে আবেদন-নিবেদন ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে তৎকালীন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছেও একই দাবি জানানো হয়। এর প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে ৯ম পে-কমিশন গঠন করা হয় এবং কমিশন ইতোমধ্যে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কিন্তু আশ্বাস দেওয়া হলেও পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে সংগঠনের প্রত্যাশা—দীর্ঘ ১১ বছরের বঞ্চনা এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয় বিবেচনায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে বৈষম্যহীন ৯ম পে-স্কেল কার্যকর করা হবে।
সংগঠনের নেতারা বলেন, প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারীর অসহায়ত্বের বিষয়টি বিবেচনা করে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগেই ৯ম পে-স্কেলের গেজেট জারি করলে কর্মচারীদের মুখে হাসি ফুটবে।
স্মারকলিপিতে আরও অভিযোগ করা হয়, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটি ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন ও পদবৈষম্য দূর না করে কেবল প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এমনকি অবসরের পরও কর্মকর্তাদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে ১১-২০ গ্রেডে কর্মরত কর্মচারীরা কোনো বাস্তব সুফল পাননি।
এছাড়া বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকদের যুক্তিসংগত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—এ বিষয়টিও স্মারকলিপিতে তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, একজন কর্মচারীর ছয় সদস্যের পরিবারের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২৫০ টাকা বেতনে তিন বেলা খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা, অতিথি আপ্যায়ন ও ন্যূনতম বিনোদন ব্যয় নির্বাহ করে মানবিক ও সামাজিক মর্যাদা বজায় রেখে জীবনযাপন করা সম্ভব নয়। বর্তমানে ২০ থেকে ১১ গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকায় শেষ হয়। অর্থাৎ এই ১০ গ্রেডের মোট পার্থক্য মাত্র ৪ হাজার ২৫০ টাকা। অন্যদিকে ১০ম থেকে ১ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতন ১৬ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে ৭৮ হাজার টাকায় গিয়ে শেষ হয়—যা বেতন কাঠামোয় স্পষ্ট বৈষম্যের ইঙ্গিত বহন করে।
Leave a Reply