গণতান্ত্রিক পথযাত্রায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর এককভাবে সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রাথমিকভাবে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে আকারে ছোট কিন্তু কার্যকর একটি মন্ত্রিসভা গঠনের পরিকল্পনা করছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাজিমাত করার পর এবার মন্ত্রিসভা গঠনে বড় চমক দেখাতে পারেন তিনি—এমন ইঙ্গিত মিলছে দলীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে।
প্রাথমিক মন্ত্রিসভায় সদস্য সংখ্যা হতে পারে ২০ থেকে ২২ জনের মধ্যে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের শরিক দলগুলোর প্রতিনিধিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। ফলে মন্ত্রিসভা ছোট হলেও রাজনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ রাখার কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া দুইজন টেকনোক্র্যাট কোটায় যুক্ত হতে পারেন বলে জানা গেছে। বিশেষ করে অর্থ ও পররাষ্ট্র—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের বাইরে থেকে দেশে-বিদেশে অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের দায়িত্ব দেওয়ার চিন্তা চলছে। এতে বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে গতি আনার লক্ষ্য রয়েছে।
ড. আব্দুল মঈন খানকে স্পিকার, মির্জা আব্বাসকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, সালাহউদ্দিন আহমেদকে স্থানীয় সরকার, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে বাণিজ্য এবং এএনএম এহসানুল হক মিলনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
এছাড়া গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নামও মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য হিসেবে ঘুরছে। স্থায়ী কমিটি ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নতুন মুখের সংযোজন হিসেবে মন্ত্রিসভায় একাধিক মুখ যুক্ত হতে পারেন। সম্ভাব্যদের মধ্যে রয়েছেন রুহুল কবির রিজভী (তথ্য ও সম্প্রচার-টেকনোক্র্যাট কোটায়), ইসমাইল জাবিউল্লাহ (জনপ্রশাসন-টেকনোক্র্যাট), শহীদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি (প্রতিমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র) এবং হুমায়ুন কবির (চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা-প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র; টেকনোক্র্যাট)।
ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন ও অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের নামও আলোচনায় রয়েছে; মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পেতে পারেন বলে জানা গেছে।
এদিকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনের অংশীদারদের নিয়ে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের ঘোষণা আগে থেকেই দিয়েছিল বিএনপি। সেই অনুযায়ী শরিক দলগুলোর কয়েকজন নেতাকেও মন্ত্রিসভায় রাখা হবে বলে জানা গেছে। সম্ভাব্যদের মধ্যে রয়েছেন ববি হাজ্জাজ, আন্দালিব রহমান পার্থ (বিজেপি), নুরুল হক নুর (গণঅধিকার পরিষদ), ড. রেজা কিবরিয়া (অর্থ মন্ত্রণালয়) এবং ১২ দলীয় জোটপ্রধান মোস্তফা জামাল হায়দার (টেকনোক্র্যাট কোটায় বিবেচনায়)।
সরকার গঠনের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়েও অভ্যন্তরীণ আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনেই এ প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান—দুজনই দলের প্রবীণ ও পরীক্ষিত নেতা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ হতে পারে। এরপরই তাদের শপথ গ্রহণ এবং মন্ত্রিসভা গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। এমপিদের শপথ পড়ানো নিয়ে ইতোমধ্যে বৈঠক হয়েছে, যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
কক্সবাজার-১ আসন থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, কেমন মন্ত্রিসভা হতে যাচ্ছে তা দেখতে দেশবাসীকে অল্প কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারের নির্বাচন একটি মাইলফলক; বিশ্ব সম্প্রদায় এই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকে নজর রেখেছিল এবং বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া প্রায় শতভাগ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।
নতুন সরকারের মূল লক্ষ্য সম্পর্কে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার। শহীদদের আকাঙ্ক্ষা ও তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি মেধা ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র গঠনই হবে সরকারের প্রধান লক্ষ্য। দলের নির্বাচনী ইশতেহার ও ঘোষিত ‘৩১ দফা’ অনুযায়ী সংবিধানের কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ছাড়া ‘জুলাই জাতীয় সনদ’কে একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে। নতুন সরকারের তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন এবং দুর্নীতি নির্মূল।
স্বাধীনতার পর সবচেয়ে কার্যকর ও আইনপ্রণয়নমুখী সংসদ গঠনের প্রত্যাশা নিয়ে বিএনপি এখন সরকার গঠনের শেষ প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।
Leave a Reply